![]() |
| সৌমিলি |
(ঘরে পড়ার টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে হাতের উপর মাথা রেখে চেয়ারে বসে আছে সদ্য মাধ্যমিক পাস করা সৌমিলি। হঠাৎ গ্লাস হাতে মায়ের প্রবেশ।)
মা- কিরে, অমন করে বসে আছিস যে,নে গরম দুধটুকু খেয়ে নে।
সৌমিলি- না খাব না (মাথা না তুলে)
মা - কেন রে মা, আরে বাবার উপর রাগ করতে আছে ? তোর বাবার স্বপ্ন চোখে মস্ত বড় ডাক্তার বানাবেন, তার বন্ধুদের পর্যন্তও সে কথা বলেছেন, এখন যদি তুই ডাক্তারী না পড়তে চাস তাহলে তার মুখটা কেমন শুকিয়ে যাবে বলতো ?
সৌমিলি - আচ্ছা মা, তোমার কি মনে হয়, আমি বায়োসায়েন্স নিয়ে ইলেভেনে ভর্তি হলেই ভালো রেজাল্ট করবো ? আর তরতর ক'রে জয়েন্টে চান্স পেয়ে মস্ত বড় ডাক্তার হয়ে যাবো ?
মা - আচ্ছা সে দেখা যাবে'খন, নে গ্লাসটা আগে খালি করে দে।
সৌমিলি - (মায়ের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে দুধটুকু খেয়ে মায়ের হাতে দেয়) যে সাবজেক্টে আমার মনই নেই, তা পড়বো কি করে ? আমার মন যে পড়ে আছে অন্য সাবজেক্টে। তোমাকে যদি এখন আমাকে, বাবাকে ছেড়ে অন্য কোথাও, ধরো, কোনো নির্জন দ্বীপে গিয়ে থাকতে বলা হয়, তুমি কি থাকতে পারবে ?
মা - ওরে না রে মা, সে কি থাকা যায় ?
সৌমিলি - তাহলে আমাকে কেন তা করতে বাধ্য করো ?
মা - তাহলে তুই আর্টসেই ভর্তি হবি ?
সৌমিলি - হ্যাঁ
মা - (মাথায় হাত বুলিয়ে) শোন, তোর বাবার উপর রাগ করে থাকিস নে, তোকে নিয়ে তার কত স্বপ্ন ! আমি তাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করবো।
(বাবার প্রবেশ)
বাবা - হা হা, ওকে বোঝাতে পারলে না, এখন আমাকে বোঝাবে ? সারা জীবনই তো আমাকে বুঝিয়ে এলে, এখন দেখো মেয়েকে একটু বোঝাতে পারো কিনা।
মা - বুঝিয়েছি, কিন্তু ও বলছে ও বায়োসায়েন্স নিয়ে ভর্তি হবে না, আর্টস নিয়েই পড়বে।
বাবা - আর্টস ? তারপর গ্রাজুয়েশনে গিয়ে আইন ? তার মানে মা (মেয়ের দিকে ফিরে) তুই শেষমেষ সেই ওকালতির ব্যবসাই ধরবি ? (সৌমিলি নীরব)
মা - ওর তো সেটাই ইচ্ছা।
বাবা - আরে নীলা, ওকালতির ব্যবসা যে কি জঘন্য পেশা তা কি তুমি জানো ? সারাদিন কেবল অপরাধ আর আসামিদের নিয়ে পড়ে থাকা, ভাবতে পারো ? একবার ভেবে দেখো কোন জগত ওটা, কোন জগতে ও পা রাখতে চাইছে।
মা - একবার ভেবে দেখ মা।
সৌমিলি - ভেবেছি মা।
মা - আবার ভাব।
সৌমিলি - (চেয়ার ছেড়ে উঠে) আসছি (বলে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায়)
মা - দেখেছো মেয়ের অভিমান ! তুমি আর না কোরো না।
বাবা- দেখো, যা ইচ্ছা হয় করো। আমার কথা যখন শুনবে না, তখন আমি আর কি করতে পারি ? তাছাড়া আমাদেরও উচিত ওর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির মর্যাদা দেওয়া।
মা - ঠিক তাই।
বাবা - তবে হ্যাঁ, দেখো, পরে যেন আমার দোষ দিও না। আমার কিন্তু ইচ্ছা ছিল ও মস্ত বড় ডাক্তার হোক। (দিদিমনির প্রবেশ)
দিদিমণি - আচ্ছা, মেয়েকে তাহলে ডাক্তার বানাতে চান রতন বাবু ? বাহ্, বেশ !
রতনবাবু - ও ডাক্তার হতে চায় না।
দিদিমণি - তবে কি হতে চায় ?
রতনবাবু - ও আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে চায়, আইনজ্ঞ হতে চায়।
দিদিমণি - এতো ভালো রেজাল্ট করে ডাক্তারী ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে আইন ? আইন নিয়ে পড়বে ?
রতনবাবু - হ্যাঁ
দিদিমনি - কিন্তু কেন ?
রতন - সে ও-ই জানে। ওর কাছে শুনে দেখুন। দিদিমণি - দেখি ডাকুন তো ওকে, ওর সাথে একটু কথা বলি।
রতন - সৌমিলি (জোরে ডাক দেয় বাবা), মা এদিকে আয় একটু।
সৌমিলি - (অন্তরাল থেকে) হাঁ বাবা, আসছি।
মা - আচ্ছা বসুন দিদিমণি, আমি একটু চা করে আনি।
(সৌমিলির প্রবেশ)
বাবা - দেখ, দিদিমণি তোর সঙ্গে কথা বলবেন।
(বাবার প্রস্থান)
দিদিমণি -হাঁ,বস সৌমিলি, তোর সাথে একটু কথা বলি। (সৌমিলি বসে) তা সৌমিলি তোর তো চমৎকার রেজাল্ট হয়েছে। তা ভবিষ্যতে কি নিয়ে পড়তে চাস ?
সৌমিলি - আমি আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে চাই দিদিমনি।
দিদিমনি - সে কি ? আইন নিয়ে ? তুই এত ভালো রেজাল্ট করেছিস, তোর তো ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে যাওয়া উচিত।
সৌমিলি - কেন ? তাতে লাভ ? আর আইনের সমস্যা কি দিদিমনি ?
দিদিমনি - ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া মানে তো জীবন তৈরি হয়ে যাওয়া, ভবিষ্যৎ নিশ্চিত। আর আইন ? বড়ই অনিশ্চিত পেশা।
সৌমিলি - পড়াশুনাটা কি জন্য দিদিমণি ? শুধু কি পেশার কথা ভেবে পড়াশোনা করতে হবে ? শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে কি দেশদুনিয়া চলে ? দিদিমণি - না না, তা চলবে কেন ? জগতসংসারকে সচল রাখার জন্য সবাইকে দরকার। সে মুটে মজুর থেকে শুরু করে মন্ত্রী-মিনিস্টার, অফিসার সবাইকে দরকার।
সৌমিলি - একটা কথা ভেবে দেখুন তো দিদিমণি, আমাদের শরীরে রক্ত প্রবাহিত হয়তো ?
দিদিমণি - হ্যাঁ, হয়।
সৌমিলি - হৃদপিণ্ড থেকে বেশিরভাগ রক্তই যদি মস্তিষ্কে প্রবাহিত হয়, আর হাত-পা বা অন্যান্য অঙ্গে যদি অতি অল্প রক্ত প্রবাহিত হয়, তাহলে কি শরীর সুস্থ থাকবে দিদিমণি ?
দিদিমণি - না, মোটেই না।
সৌমিলি - তাহলে ভাবুন তো দিদিমণি, আপনি তো বললেন, মেধাবী মানেই ডাক্তারী ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে, তাহলে অন্য ক্ষেত্রগুলোতে তো কেবল কম মেধাবীরা গিয়ে ভিড় করবে। তাহলে সেই সব ক্ষেত্র কি উৎকৃষ্ট হতে পারবে ?
দিদিমণি - ঠিক বলেছো সৌমিলি, একদম ঠিক। সব ক্ষেত্রেই উন্নত মেধা দরকার তাহলে সব ক্ষেত্রেরই সুসামঞ্জস্য বিকাশ ঘটবে। তবেই দেশের সুষ্ঠু বিকাশ হবে।
সৌমিলি - বলুনতো দিদিমণি, দেশের বিচার ব্যবস্থার হাল এখন কি ?
দিদিমণি - বিচারব্যবস্থার হাল ? তা যত কম বলে পারা যায় ততই ভালো। ন্যায়বিচার যে কি জিনিস সেটা বলাই মুশকিল। মামলা একটা শুরু হলে এ জীবনে তা শেষ হবে কিনা বলা দুষ্কর। নির্যাতিত, অত্যাচারিত মানুষ বিচার পাচ্ছে না। আর দুষ্কৃতীরা সব দুষ্কর্ম ক'রে জামিন নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সৌমিলি - ঠিক তাই,দিদিমণি। অনেক নিরপরাধ মানুষ মিথ্যে মামলায় ফেঁসে বছরের পর বছর জেল খাটছে। তাদের জীবনটা জেলের ভিতর পচে পচে নষ্ট হচ্ছে। আর যারা চোখের সামনে অপরাধ করছে তাদের অনেকেই সমাজের বুকের উপর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই সুন্দর পৃথিবীটাকে তারা তছনছ করছে।
দিদিমণি - ঠিক বলেছিস সৌমিলি। এই সুন্দর পৃথিবীটা উপভোগ করছে, ধরণীর বুকের উপর উল্লাসে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে দুষ্কৃতীরা, আর নিরীহ মানুষেরা লুকোচ্ছে গর্তের মধ্যে, কিংবা তোর কথা মতো পচে পচে মরছে জেলের মধ্যে, এই বিচার ব্যবস্থার কারণেই। যাদের টাকা আছে এই দেশের বিচার ব্যবস্থা তাদের টিকিটাও ছুঁতে পারেনা, বড় বড় উকিল ধ'রে তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর যাদের টাকা নেই তারা বিনা দোষে মিথ্যে মামলায় জেল খাটছে।
সৌমিলি - মানে টাকা যার, বিচার তার। আর যার টাকা নেই, তার বিচার নেই। তাই হচ্ছে নাকি ?
দিদিমণি - একদম ঠিক তাই।
দিদিমণি - একদম ঠিক তাই।
সৌমিলি - তাহলে আপনি কি মনে করেন না, এই বিচারব্যবস্থার সংস্কার, পরিমার্জন ক'রে একে উন্নত, জনহিতৈষী ও সমাজ কল্যাণ মুখী ক'রে গড়ে তোলা দরকার ? আর তার জন্য মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের আইনের জগতে আসা দরকার ?
দিদিমণি - একদম ঠিক। এ দেশের বিচারব্যবস্থা সেই যে ব্রিটিশরা তৈরি ক'রে রেখে গেছে, এখনো ঠিক সেই অবস্থাতেই পড়ে আছে। এখনো এর উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ ক'রে গরীব মানুষ ভুগছে। আর পয়সাওয়ালা মানুষ এর ফায়দা তুলছে। ব্রিটিশরা তাদের বিচার ব্যবস্থার কাঠামো এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে তাদের অনুগত জমিদার শ্রেণী একতরফাভাবে এর সুবিধা পায় ও কৃষকদের উপর অবাধে শোষণ চালিয়ে যেতে পারে, আর কৃষকরা যাতে এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এখনো ঠিক তাই চলছে। বিচার ব্যবস্থার দ্বারা গরিব মানুষ মার খাচ্ছে, আর বিত্তশালীরা ফায়দা তুলছে। ঠিক সৌমিলি, তোর কথা আমি বুঝেছি। তুই আইন নিয়েই পড়, বড় আইনজ্ঞ হ। আর মানুষ যাতে ন্যায় বিচার পায় তার উপায় বের কর।
(দিদিমণি উঠে এসে সৌমিলির মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেন এবং তারপর তাকে আলিঙ্গন করেন)
![]() |
| ও পড়ুক আপনমনে |


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন