বুধবার, ১ মে, ২০১৯

শিক্ষায় ব‍্যবসা-লগ্নির সম্ভাবনা ও শিক্ষার বেসরকারীকরণের প্রবণতা



পুঁজি বিনিয়োগের বিশাল ক্ষেত্র

শিক্ষা একটা বিশাল ক্ষেত্র।পাঠ‍্যপুস্তক,নোটবই, কোচিং, টিউশন থেকে শুরু করে শিক্ষকতার পেশা ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব‍্যবসা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো হচ্ছে।
পুস্তক ব‍্যবসা বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব‍্যবসায় বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে।কিন্তু যে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগকারীদের হাতে জমে আছে তার সদ্ব‍্যবহার করার ক্ষেত্রে এটুকুই যথেষ্ট নয়।সমগ্র দেশজুড়ে যে বিপুল সংখ্যক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের বেতনদান থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও শিক্ষা খাতের যাবতীয় ব‍্যয় সরকারী কোষাগার থেকে ব‍্যয়িত হয়।এর ফলে ঐসব ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগের কোন সুযোগ নেই।ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ একটি নির্দিষ্ট পরিসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।ফলে ইচ্ছা করলেও, লোভ হলেও শিক্ষার এই বিশাল ক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ করার কোনই উপায়ই নেই,এ কথা বুঝে নিয়ে পুঁজিপতিদের অসহায়ের মতো বসে বসে নিরুপায় হয়ে হাত কচলাতে হচ্ছে।ফলে তাদের জমে থাকা বিপুল পরিমাণ টাকায় মরচে পড়ে যাচ্ছে।অথচ শিক্ষা ক্ষেত্রটি ছিল পুঁজি বিনিয়োগের পক্ষে একটি নিরাপদ,নিশ্চিত, সুরক্ষিত, লাভজনক ও বিপুল সম্ভাবনাময় লোভনীয় ক্ষেত্র।

বিএড থেকে স্কুলশিক্ষা

বেসরকারি বিএড কলেজগুলির ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে,কলেজ বিল্ডিং একটি তৈরি করো,এনসিইটি অনুমোদন করিয়ে নাও,ব‍্যস্।তারপর নাম কা ওয়াস্তে মাইনে দিয়ে কিছু শিক্ষক ও কর্মচারী জুটিয়ে নাও। ব‍্যস্,আর ভাবতে হবে না।ব‍্যবসা একেবারে তরতর করে চলবে।দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যে পরিমাণে বেড়েছে তাতে সস্তায় শিক্ষক,শিক্ষিকা ও কর্মচারী যোগাড় করতে কোন বেগ পেতে হবে না।
এটা তো গেল পুঁজি বিনিয়োগের দিক।এইটুকু পুঁজি একবার বিনিয়োগ করে ফেলতে পারলেই কেল্লা ফতে।এবার বিপুল অঙ্কের ডোনেশন নিয়ে ছাত্র ভর্তি করো ব‍্যস্।বছর ফিরতেই বিনিয়োগকৃত লগ্নি কয়েকগুণ হয়ে হাতে ফিরে আসবে।
বিএড কলেজের মতো স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করা গেলে সেটা হবে একটা বিরাট ব‍্যাপার।বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এখানে।
কিন্তু সেটা কি প্রকারে সম্ভব ? এখানে সরকারি শিক্ষা ব‍্যবস্থা একটা বড় বাধা হয়ে সামনে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সেটা করতে গেলে এই সরকারি শিক্ষা কাঠামোকে না ভেঙে কোনমতেই তা করা সম্ভব নয়।
সে আর এমন কি কঠিন কাজ ? সরকার তো আমরাই গড়ি,আমরাই ভাঙি। তাহলে সরকারি কাঠামোকেই বা কেন ভাঙতে গড়তে পারবো না ? এটা করতে পারলে আমাদের যেমন লাভ, তেমনি যারা সরকারে থাকবে তাদেরও তো লাভ ছাড়া লোকসান কিছু নেই।কিন্তু সেই কথাটা শুধু তাদের বোঝাতে হবে, এইটাই আসল কাজ।আসলে ব‍্যবসা জিনিসটাই তো অন‍্যকে কতটা তুমি বোঝাতে পারলে।অন‍্যকে বোঝাতে পারাটাই ব‍্যবসার মূলমন্ত্র।ভালো করে বোঝাতে পারলে সবই বিকিয়ে যায়।
এখন আমাদের বোঝাতে হবে গভর্ণমেন্টকে।একবার বুঝিয়ে রাজী করাতে পারলেই হল।তারপর গভর্ণমেন্টই তার ক্ষমতাকে প্রয়োগ করে আমাদের জন্য যা করার তা করে দেবে।ব‍্যসসসসস্।

গভর্ণমেন্টের সুবিধা

গভর্ণমেন্ট কেন বুঝবে না ? অবশ্যই বুঝবে। সরকারি শিক্ষা ব‍্যবস্থা চালাতে গভর্ণমেন্টের অনেক খরচ।সেখান থেকে ব‍্যক্তিগত লাভের কিছু নেই।পার্টি ফান্ডেও টাকা আসবে না সেখান থেকে। শিক্ষা পরিকাঠামো, বেতন, স্কলারশিপ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের জন‍্য কেবল খরচ আর খরচ। আবার সরকারি ব'লে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন‍্য সংরক্ষণের নিয়মও মানতে হবে। ইত্যাদি নানা জ্বালা।
কিন্তু শিক্ষার বেসরকারিকরণ যদি করা যায়, তাহলে শিক্ষার পিছনে সরকারের খরচখরচা বলে আর কিছু থাকলো না, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগেরও দরকার নেই, রিজার্ভেশনেরও আর দরকার নেই, স্কলারশিপ দেওয়ারও আর দরকার নেই। যা করার সবই হবে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে। ফলে পুরো ব‍্যবস্থাটা উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্গীয় শ্রেণীর কুক্ষিগত হয়ে যাবে, নিম্নবিত্ত ও নিম্নবর্গের লোক আর কোন সুবিধাই নিতে পারবে না। এটা একটা বড় ক‍্যালকুলেশন। উপরন্তু বেসরকারি উদ‍্যোগপতিদের কাছ থেকে মাসোহারা থেকে বছর বছর পার্টিফান্ডে বড় রকমের ডোনেশনও হাসিল করা যাবে। আরো একটা বড় কথা যেটা সেটা হল, শিক্ষাব‍্যবস্থার বেসরকারিকরণ করতে পারলে ছোটলোকের ছেলেমেয়েগুলো আর পড়াশোনাই করতে পারবে না, শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে উচ্চবর্গের কুক্ষিগত হয়ে যাবে, ফলে চাকরির বাজারেও উচ্চবর্গের পরিবারের ছেলেমেয়েদের ছোটলোকের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খুব একটা প্রতিযোগিতায় আসতে হবে না।ফলে শিক্ষা ও চাকরি দু'টোই কেবলমাত্র উচ্চবিত্ত উচ্চবর্গের একচেটিয়া দখলে চলে আসবে। ছোটলোকের ছেলেমেয়েদের জন‍্য পড়ে থাকবে চাষবাস, দিনমজুরী আর গোলামী।
উচ্চবিত্তের পাল্লায় প'ড়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তও বেসরকারি স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করাবে মাসে পঁচিশ ত্রিশ হাজার মাইনে দিয়ে যা ক্রমশঃ বাড়তে থাকবে। সরকারি স্কুলগুলো সব উঠে গেলে বেসরকারি স্কুলগুলোই থাকবে শিক্ষার একমাত্র বিকল্প। আর তখন বেসরকারি স্কুল কর্তৃপক্ষ যে মাইনে ধার্য করবে অভিভাবকরাও তার দিতে বাধ্য থাকবে। আর এই বিপুল শিক্ষার ভার বহন করার ক্ষমতা না থাকলে ছেলেমেয়েদের তারা স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হবে। ইতিমধ্যেই সরকারি স্কুলগুলিকে যেভাবে "খিচুড়ি স্কুল" ব'লে প্রচার শুরু হয়েছে, এবং সন্তানকে বেসরকারি স্কুলে পড়ানোর ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে তাতে সেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা খুবই নিকট বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সন্তান আজ মাসিক পঁচিশ ত্রিশ হাজার টাকা মাইনেয় বেসরকারি স্কুলে পড়ছে, সে শিক্ষা শেষে যখন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরিতে ঢুকবে, তখন মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে তাকে বেসরকারি স্কুলেই শিক্ষকতা করতে হবে, কারণ, সরকারি স্কুল না থাকলে সরকারি স্কুলের সরকারি চাকরিও আর থাকবে না। আর তাই, বেসরকারি স্কুলের মালিক তার স্কুলের পোষা শিক্ষকদের যে বেতন দেবে বেসরকারি শিক্ষকেরাও সেই বেতনে চাকরি করতে বাধ্য থাকবে। কারণ, তাদের কাছে এ ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকবে না।

কোন মন্তব্য নেই:

Featured post

শীতের স্বাস্থ্য-সমস্যা ও তার প্রতিকার How to heal the health problems of Winter season

শীতে পরুন গরম পোশাক শীত একটি সুন্দর মনোরম ঋতু।কিন্তু শীতকাল অনেকের কাছেই খুব সমস্যার, বিশেষ করে যাদের ঠান্ডার ধাত বা অ্যাজমা ইত‍্যাদি...