![]() |
| Indian soldier |
কে প্রকৃত ভারতীয় ?
১. যারা বুক পেতে ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধিকার লাভের লড়াই করেছে, - তারা ?
২. যারা মাতৃভূমি দখলকারী শত্রুর হাতে হাত মিলিয়ে শত্রুকে মাতৃভূমিকে লুন্ঠন করতে যথেচ্ছ সাহায্য করেছে, এবং নিজেরাও সেই লুঠের বখরার ভাগ পেয়েছে, এবং তা ভোগ করেছে,- তারা ?
৩. শেষমেশ মাতৃভূমিকে যারা নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিয়েছে, - তারা ?
দেশটা কার ? - নেতার,না জনতার ?
মধ্যযুগের ভারতের দুইজন রাষ্ট্রনায়ক ভারতবাসীর মনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।একজন রাজপুত বীর রানা প্রতাপ সিংহ,অন্যজন মারাঠা বীর শিবাজী।
রাণা প্রতাপ ও ভীল জনজাতি
একমাত্র রাণা প্রতাপ সিংহই সেই বীর রাজপুত যোদ্ধা যিনি কখনো মোগলশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।রাণা প্রতাপ সিংহই একমাত্র রাজপুত রাজা যার সৈন্যবাহিনী রাজপুত নয়,ভীল উপজাতির সেনাদের দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন রাণা প্রতাপ,যে ভীল সৈন্যদের বাহুবলের উপর ভর করে রাণা প্রতাপ পরাক্রমশালী রাজপুত বীরের শিরোপা ও সম্মান পেয়েছিলেন।রাণা প্রতাপের সেই গৌরব বলতে আমরা রাজপুতদের গৌরব বুঝি,ভীলদের নয়।গৌরব তো দূরের কথা,ভীলদের এই ভূমিকা বা অবদানের কথা আমরা জানি কয়জন ?মেবার বলতে আমরা রাজপুতদের মেবার বুঝি,মেবার কখনো ভীলদের মেবার হয়ে ওঠেনি।একইভাবে এ ভারত ইতিহাসের পাতায় কেবল রাজপুতদেরই জ্বলজ্বল করতে দেখি,দূরবীণ দিয়েও ভীলদের কথা কোথাও পাওয়া যায় না।কারণ,ইতিহাস তৈরি করেছে ভীলরা,কিন্তু তা লিখেছে রাজপুতরা।তাই ইতিহাসে ভীলদের কোন চিহ্ন নেই।লড়াই করে দেশের মাটিকে রক্ষা করেছে ভীলরা,কিন্তু সে মাটির মালিকানা পেয়েছে রাজপুতরা।
শিবাজী ও মাওলি জনজাতি
তেমনি,ভারত ইতিহাসের আর এক বীর মহানায়ক মারাঠা বীর শিবাজী,যিনি বিজাপুরের সুলতান, দোর্দন্ডপ্রতাপ মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে লড়াই করে দাক্ষিণাত্যে গড়ে তুলেছিলেন মারাঠা সাম্রাজ্য।তার দুরন্ত দুর্ধর্ষ দুঃসাহসিক লড়াইয়ের কথা আমরা জানি।কোথায় পেয়েছিলেন তিনি এত শক্তি, এত তেজ ?আমরা জানি এই মারাঠা শৌর্যের কথা।কিন্তু খুব কমই
জানি মাওলিদের কথা।শিবাজীর এই উত্থান, এই মারাঠা পরাক্রমের আসল কারিগর ছিলেন অসম্ভব কষ্টসহিষ্ণু দুর্ধর্ষ নির্ভীক মাওলি উপজাতির যোদ্ধারা।মারাঠা সাম্রাজ্য মাওলিরাই নির্মাণ করেছে,মারাঠা শৌর্যবীর্য গৌরব মাওলিদের বাহুবলেই অর্জিত হয়েছিল।কিন্তু ইতিহাস মারাঠাদের।ইতিহাসে মাওলিরা কোথাও নেই।
উপরন্তু পরবর্তীতে মারাঠা পেশোয়াদের শাসনকালে অস্পৃশ্যতা সকল সীমা অতিক্রম করেছিল।নিম্নবর্গের মানুষকে সমাজে অচ্ছুৎ বানিয়ে তাদের গলায় হাড়ি ও পেছনে ঝাঁটা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।অথচ,এই মারাঠা সম্রাজ্য নির্মিত হয়েছিল নিম্নবর্গের মানুষ মাওলিদের দুঃসাহস ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে।
অথচ,মনুর বিধানে তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষের অস্ত্র ধরার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
রাণাপ্রতাপ কখনো মোগলদের কাছে মাথা নোয়ায়নি,কারণ,তার সৈন্যবাহিনী তৈরি ছিল ভীল উপজাতিদের দিয়ে।
অথচ,আমরা রাজপুতদের বীরত্বের জয়গান করি,যারা ছিল মোগলদের আজ্ঞাবাহী।
মারাঠা বীর শিবাজীর উত্থান সম্ভব হয়েছিল মাওলি উপজাতিদের বাহুবলের দ্বারা, অথচ আমরা মারাঠা অস্মিতার জয়গান করি,মাওলিদের চিনি না।
বাংলার যোদ্ধাজাতি ছিল চন্ডাল,হাড়ি ডোম,পৌন্ড্র,রাজবংশী।
অথচ তাদের কিভাবে টিপে চেপে আধমরা করে রাখতে হবে,তার প্রচেষ্টা প্রাচীন কাল ধরে চলে আসছে,অবশ্যই রাজক্ষমতা ও ধর্মের ফুসমন্ত্রকে ব্যবহার ক'রে।
তার প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত, তার আধুনিক সংস্করণ এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি,তার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে এই এনআরসি,রাজশক্তিকে ব্যবহার করে এদেরকে আবার পঙ্গু করে দাও,আবার এদেরকে ক্রীতদাসের পর্যায়ে নামিয়ে দাও।এরা বড় দ্রুতই উপরের দিকে উঠছে,আর তত দ্রুতই আমাদের প্রভুত্ব ও আধিপত্য সমাপ্তির দিকে এগোচ্ছে।নাহ্,প্রভুত্বের সুখ কোনমতেই হাতছাড়া করা যায় না।অতএব ওদের খাল্লাস করো।
যে কারণে অতীতে তারা ভারতকে রক্ষা করতে পারেনি, সেই একই কারণে ভবিষ্যতেও তারা ভারতকে রক্ষা করতে পারবে না,যদি তারা তাদের সেই আদিম চরিত্র ও প্রবৃত্তি ত্যাগ না করে।
আজ কেন এনআরসি করতে হচ্ছে ? দেশটা যখন ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হলো তখন দাবি উঠেছিল লোক বিনিময়ের। তখন যদি লোক বিনিময় করা হতো তাহলে তো আজ এনআরসি করার কোন প্রয়োজন হতো না। সন্ত্রাস বলেও দেশে কিছু থাকত না, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিও বাড়াবাড়ি করতে পারত না। তখন যে কাজটা করা অতি প্রয়োজন ছিল, লোক বিনিময়, সেটা তখন করা হলো না। দেশভাগের ফলে আজ যারা ভুক্তভোগী, যারা উদ্বাস্তু, এন আর সি ক'রে তাদের নাগরিকত্বহীন করা, তাদের মাতৃভূমি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা কোন যুক্তির কথা নয়। দেশভাগের সময় লোক বিনিময় না ক'রে তখনকার ভারতীয় নেতৃবৃন্দ যে ভুল করেছিলেন আজ যদি এনআরসি ক'রে উদ্বাস্তু অসহায় মানুষগুলোকে যদি নাগরিকত্বহীন করা হয়, ভারত ভূমি থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা হয় তাহলে আগের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করা হবে। এই উদ্বাস্তু মানুষগুলি দেশভাগের আগেও যেমন ভারতীয় ছিলেন তেমনই এখনো এরা ভারতীয়। এরা ভারতমাতার মৃত্তিকা প্রসূত সন্তান। এদেরকে যদি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় তাহলে ভারতকেই দুর্বল করা হবে। এরা ভারতীয়। এদের হাতে ভারত নিরাপদ। এদের শক্তি ভারতের শক্তি। এদের অসহায়তাই ভারতের অসহায়তা। এদের কান্না ভারতের কান্না। এদের দুঃখ ভারতেরই দুঃখ। এদের কষ্ট ভারতের কষ্ট। এদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ভারতের আশা-আকাঙ্ক্ষা। এদের স্বপ্নই ভারতের স্বপ্ন। এদের ব্যর্থতাই ভারতের ব্যর্থতা। এদের সাফল্যই ভারতের সাফল্য। এদের আনন্দই ভারতের আনন্দ। এদের পরাজয় ভারতেরই পরাজয়। এদের জয় ভারতেরই জয়। তাই এদের কে হারিয়ে, এদেরকে তাড়িয়ে, এদেরকে বিতাড়িত ক'রে ভারত কাদেরকে লালন করবে ? এই ভারতভূমিতে কারা ভারতের জয় গান গাইবে ?
যারা দেশনেতা,তাদেরকে নিজ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে।মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ইতিহাসের দাবী মেনে আইন তৈরি করতে হবে,স্রেফ নির্বাচনী স্বার্থ দেখে নয়।ইতিহাসকে কোন ভবিষ্যতের দিকে চালিত করতে হবে,একজন রাষ্ট্রনেতার অবশ্যই সে বোধ থাকতে হবে।
মনে রাখতে হবে, মা যেমন তার সন্তানকে হারিয়ে সুখী থাকতে পারে না, দেশমাতৃকাও তার সন্তানদের দূরে সরিয়ে দিয়ে সুখী হতে পারে না।তাই দেশভাগের ফলে দেশের যেসব সন্তানেরা আজ দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন তাদেরকেও কোলে টেনে নিতে হবে।দেশকে যারা ভাগ করেছে তারা দেশের বুকের উপর দাপাবে,আর দেশের প্রকৃত সন্তানেরা দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বুক চাপড়াবে তা হতে পারে না।আর তা যদি হয়,তাহলে তা দেশের পক্ষে মোটেই মঙ্গলজনক নয়।
দেশের আত্মা যে জনসাধারণ যারা দেশকে ভাগ করেনি, যারা দেশভাগের শিকার হয়েছে তাদের নিয়ে রাজনীতি নয়, তাদের নিয়ে ছেলেখেলা নয়।
পাকিস্তানের দাবীতে যারা ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে করলো,দাঙ্গা বাধালো,মানুষ কাটলো তারাই আজ ভারতের প্রকৃত নাগরিক, আর যে মাস্টারদা সূর্য সেন দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে প্রাণ বিসর্জন দিলেন তার বংশধরেরা আজ চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় এলে উদ্বাস্তু বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচিত হবে তা হতে পারে না। দেশের নেতাদের অপদার্থতার দায় সাধারণ মানুষের উপর চাপানো ঠিক নয়। লোকবিনিময় না করে যে ভুল করেছিলেন তখনকার দেশনেতারা উদ্বাস্তুদের নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেওয়াই এখন সেই ভুলের একমাত্র সমাধান। তারপর তুমি এনআরসি করো আর যাই করো করে বেড়াও।
ভারত কি, আর ভারতীয় কারা, ভারতীয়ত্বই বা কি সেটা অনুধাবন করেই নির্ণয় করতে হবে কে ভারতে থাকবে,আর কে থাকবে না; কে ভারতীয় বলে বিবেচিত হবে,আর কে হবে না।
জয় হিন্দ।।



1 টি মন্তব্য:
সাম্প্রদায়িক বিদ্বেশপূর্ণ মন ও চিন্তাধারা পোষণ করে কোনোদিন সঠিক ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। আর এর ফলে দেশের কল্যাণ বই অকল্যাণই বেশি হবে। আপনি একটি সমুদয়ের উপর বিদ্বেশ বশত এই ত্রুটিপূর্ণ তথ্যটি তুলে ধরেছেন। অথবা আপনার ইতিহাসের জ্ঞান ত্রুটিপূর্ণ।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন