জনচেতনা ও জনস্বার্থে শিক্ষক সমাজ

The role of teachers for public awareness and public interest
Vote to save democracy

চলতি লোকসভা নির্বাচনে(২০১৯) প্রত্যেক বুথে পর্যাপ্ত পরিমাণ কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবিতে শিক্ষক সমাজের আন্দোলন ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছে এবং শিক্ষক সমাজের আন্দোলনের ফলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন তাদের দাবি অনেকটা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে যেভাবে বুথ দখল ছাপ্পা ও রিগিং হয়েছে তাতে করে এবারের লোকসভা নির্বাচনেও এমনটি হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা ছিল এবং সেই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে এবং গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার রাজকুমার রায় যিনি একজন শিক্ষক তিনি যেভাবে নিহত হলেন সেই বিষয়টা কে স্মরণ করে বা মাথায় রেখে শিক্ষক সমাজ, এবারে যাতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য, প্রথম থেকেই প্রত্যেক বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী দেওয়ার জন্য আন্দোলন করে আসছে। গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য, কার্যকরী করার জন্য সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ জরুরী আর সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন করার জন্য বুথের নিরাপত্তাও জরুরি। আর ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে হলেই গণতন্ত্র রক্ষিত হবে। গণতন্ত্র রক্ষিত হলেই মানুষের স্বার্থ রক্ষিত হবে। তাই সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সুরক্ষিত করার জন্য, সৎ ও সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ বা নির্বাচন হওয়া আবশ্যক। শিক্ষক সমাজ তাদের প্রবল আন্দোলনের মাধ্যমে সেই গণতান্ত্রিক অধিকার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার কাজে অনেকটাই সফল হয়েছে। গণতন্ত্র যদি রক্ষিত না হয়, যদি অরাজকতা কায়েম হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, সমাজে গুন্ডা রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়, রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যায় অসৎ মানুষের হাতে। ফলে সামাজিক স্বার্থ বিপন্ন হয়; রাষ্ট্র, সমাজ তথা সাধারণ মানুষের অকল্যাণ হয়। শিক্ষক সমাজ শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক হিসেবে তাদের দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনা করার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার, রাষ্ট্র ও সমাজকে ন্যায়ের পথে, সততার পথে চালিত হতে বাধ্য করার। শিক্ষক সমাজ মানুষ তৈরীর কারিগর। স্কুলে তারা যেমন ছাত্র-ছাত্রীদের মানুষ করছেন, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য সুনাগরিক তৈরি করছেন ও রাষ্ট্রের জন্য রাজ কর্মচারী ও দেশকে চালিত করার জন্য সুযোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষা দানের মাধ্যমে। বর্তমানে গণতন্ত্র বিপন্নতার মুখে দাঁড়িয়ে শিক্ষক সমাজ এই বিপন্নতাকে চাক্ষুষ করছেন কারণ তারা এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যেটা মূল কাজ সেই নির্বাচন বা ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালনার মূল দায়িত্ব তাদেরকেই পালন করতে হয় এবং সেটা পালন করতে গিয়ে শিক্ষক সমাজ যখন দেখছেন তাদের চোখের সামনে গণতন্ত্র লুণ্ঠিত হচ্ছে, বুথ দখল হচ্ছে, রিগিং হচ্ছে, ছাপ্পা হচ্ছে; আর তাদেরকে কাঠের পুতুলের মত বসে থেকে নীরবে সেসব দেখা ছাড়া কোন উপায় থাকছে না, কারণ ইলেকশন কমিশন বুথের জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা করছে না। এবং রাজনৈতিক দলগুলো সমাজের সব থেকে নিকৃষ্ট গুন্ডা মস্তানদের সাহায্যে ভোট প্রক্রিয়া তথা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ভণ্ডুল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, এবং সেই কাজটা করছে প্রিসাইডিং অফিসার বা ফার্স্ট পোলিং অফিসার রূপে বুথের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের চোখের সামনে - যে শিক্ষক সমাজ সমাজের শিক্ষক, সাধারণ মানুষের শিক্ষক তাদের চোখের সামনে যখন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক স্বার্থ লুন্ঠিত হয়, তখন তাদের চোখের সামনে তাদের সব শিক্ষার ব্যর্থতা সূচিত হয়। এবং তাদের জীবনও বিপদের সম্মুখীন হয়। যারা সমাজ তৈরি করছেন, মানুষ তৈরি করছেন, সমাজ গড়ার কারিগর, মানুষ গড়ার কারিগর সেই শিক্ষক সমাজকে সেই বিপন্নতার মধ্যে পড়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়, মুখ বুজে অন্যায়কে মেনে নিতে হয়, হজম করতে হয়। তখন তারা উপলব্ধি করেন তাদের চোখের সামনেই গণতন্ত্র লুন্ঠিত হচ্ছে, সাধারণ মানুষের স্বার্থ লুন্ঠিত হচ্ছে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা দুর্বৃত্তদের দ্বারা লুন্ঠিত হচ্ছে। পঞ্চায়েত ভোটে তারা এসব হজম করতে ও সহ্য করতে বাধ্য হয়েছেন নিরুপায় হয়ে। কিন্তু এবারের লোকসভা ভোটে তারা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভুল করেননি। এটা যেমন তাদের মানবিক দায়িত্ব, এ কাজের মধ্য দিয়ে তারা যেমন মানবিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি দেশের শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিকের দায়িত্বও পালন করেছেন। তারা সমাজ রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা রাষ্ট্রকে সঠিক নেতৃত্বের হাতে রাজক্ষমতা অর্পণের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষক সমাজ যেমন সচেতন একটি সমাজ, শিক্ষকের শিক্ষকতা পেশাও তেমনি একটি মহৎ পেশা।যে শিক্ষকেরা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মানুষ করেন, সেই শিক্ষকদের গণতন্ত্র রক্ষারও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের চোখের সামনে গণতন্ত্র লুণ্ঠিত হতে দেখে তারা এখন তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রিক দায়িত্ব পালন করছেন - সাধারণ মানুষকে এটা বুঝতে হবে। সাধারণ মানুষকে আজ শিক্ষক নেতৃত্বকে সামনে রেখে তাদের সঙ্গে সমবেত হতে হবে এবং শিক্ষক সমাজ সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনা বৃদ্ধিতে এবং গন স্বার্থ রক্ষায় গণতান্ত্রিক মানুষের গণতান্ত্রিক স্বার্থ রক্ষায় যে ভূমিকা নিয়েছেন, যে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হবে শিক্ষক সমাজের সেই ভূমিকাকে উপলব্ধি করা শুধু নয়, তাদের সঙ্গে যোগদান করা এবং শিক্ষক সমাজের নেতৃত্বে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য দেশকে সঠিক, সৎ, দায়িত্ববান নেতৃত্বের হাতে উপহার দেওয়ার জন্য শিক্ষক সমাজের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত মিলিয়ে সাধারণ মানুষ, সচেতন যুব সমাজ, ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে। নইলে দেশের ক্ষমতা, রাষ্ট্রক্ষমতা ও সমাজের কর্তৃত্ব চলে যাবে গুন্ডা মাস্তান হুলিগান এবং দুর্বৃত্তদের হাতে। আর সেটা হলে সাধারণ মানুষ সমাজে সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে পারবে না, রাষ্ট্রের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার ও পরিষেবা পাবে না।আর এরকমটি হলে গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্র ব্যর্থ হবে এবং সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক স্বার্থ। তাই আজ সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান করি, শিক্ষক সমাজের নেতৃত্বকে সামনে রেখে ও তাদের অনুসরণ ক'রে তারাও যেন একই পথের পথিক হয়।
এটা আজ প্রমাণিত যে, সুসংগঠিত আন্দোলন ক'রে শিক্ষক সমাজই পারে সকল অন‍্যায়, অসততা, দুর্নীতির প্রতিবাদ ক'রে ন‍্যায় ও সত‍্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে।শিক্ষকরাই পারে সমাজকে সঠিক দিশা দেখাতে, রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে।
যেমন,এবার নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবিতে আন্দোলন ক'রে শিক্ষকরা সাফল‍্য লাভ করেছেন, তেমনি ভবিষ্যতে আরো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, যেমন, সঠিক সিলেবাস প্রণয়নে,এবং এ বিষয়ে শিক্ষকদের থেকে পরামর্শ গ্রহণ, শিক্ষাব‍্যবস্থার বহুমুখী সংস্কার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরী বলে আমি মনে করি।
এভাবেই শিক্ষক সমাজ রাষ্ট্রকে,এবং রাষ্ট্রের নাগরিক ও তার সমাজকে সঠিক দিশা দেখাতে পারে।শিক্ষকরাই পারে অধঃপতন ও অচলায়তনের এই ভগ্নস্তূপ থেকে জাতিকে নবজীবনবোধে উজ্জীবিত করতে।শিক্ষক সমাজের উদ‍্যোগ, আর আমজনতার চেতনা ও সহযোগিতা - এই দুইয়ে মিলেই পারে মানবকল‍্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।
 জয় হিন্দ।।

কোন মন্তব্য নেই:

Featured post

শীতের স্বাস্থ্য-সমস্যা ও তার প্রতিকার How to heal the health problems of Winter season

শীতে পরুন গরম পোশাক শীত একটি সুন্দর মনোরম ঋতু।কিন্তু শীতকাল অনেকের কাছেই খুব সমস্যার, বিশেষ করে যাদের ঠান্ডার ধাত বা অ্যাজমা ইত‍্যাদি...