শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার
![]() |
| Liver (Red coloured organ) |
লিভার মানব শরীরের একটি অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ।তাই লিভারের স্বাস্থ্যরক্ষায় আমাদের একটু বেশিই সচেতন হওয়া উচিত।লিভার শরীরের কত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তা বুঝতে হলে আমাদের শরীরের জন্য লিভার কি কি কাজ করে তা জানতে হবে।তাহলেই লিভারের গুরুত্ব বোঝা যাবে।
লিভার আমাদের শরীরের জন্য অগণন কাজ করে-
১. লিভার আমাদের শরীরের মধ্যে উৎপন্ন বিষাক্ত,দূষিত,ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থগুলির বিষক্রিয়া ও ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শরীরকে রক্ষা করে।দেহের মধ্যে বিপাকজাত,দূষিত, অব্যবহৃত সমস্ত প্রোটিন(যেমন, গ্লাইকোপ্রোটিন,নিউক্লিওপ্রোটিন) লিভারে চলে আসে।লিভারে অরনিথিন চক্রের মাধ্যমে সমস্ত দূষিত প্রোটিনগুলি ইউরিয়াতে পরিণত হয়,এই ইউরিয়া এখান থেকে কিডনিতে চলে যায়, কিডনি থেকে মূত্রের মাধ্যমে দেহের বাইরে বেরিয়ে যায়।
২. লিভার রক্তের প্লাজমা প্রোটিন(থ্রমবিন,প্রথ্রম্বিন) সংশ্লেষ করে,যা রক্ত তঞ্চনে সাহায্য করে।
৩. লিভার পিত্তরস তৈরি ক'রে পিত্তথলিতে জমা করে।এই পিত্তরসের মধ্যেকার পিত্তলবন ফ্যাট বা চর্বি পরিপাকে সাহায্য করে।পিত্তরস ভিটামিন এ,ডি,ই ও কে শোষণ করে।
৪. লিভার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করে, শর্করা, প্রোটিন ও ফ্যাট বিপাকে সাহায্য করে।ভিটামিন, খনিজ ও সুগার সঞ্চয় রেখে শরীরে পুষ্টির অভাব মেটায়।
৫. পরিপাকনালীর ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে শোষিত খাদ্যরস(গ্লুকোজ) প্রথমে লিভারে যায়, লিভার এর কিছুটাকে গ্লাইকোজেনে পরিণত করে সঞ্চয় করে রাখে,বাকিটা রক্তপ্রবাহে ছেড়ে দেয়,যেটা কোষকলায় গিয়ে পৌঁছায়।
৬. লোহিত রক্তকণিকা তার জীবদ্দশার শেষ মুহূর্তে লিভারে এসে বিশ্লিষ্ট হয়ে বিলিরুবিন, বিলিভারডিন,লেসিথিন ইত্যাদি তৈরি করে।এগুলি পিত্তরসের মাধ্যমে অন্ত্রে আসে,অন্ত্র থেকে মলের মাধ্যমে দেহের বাইরে বেরিয়ে যায়।
৭. লিভারের কুফার কোষ ব্যাকটিরিয়াকে ধ্বংস করে।
সংক্ষেপে লিভারের কাজকর্মের একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া গেল।এই কাজগুলো শরীরের পক্ষে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা যদি আমরা বুঝি তাহলে আমাদের শরীরের জন্য লিভার কত গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা বুঝতে পারবো।লিভার সুস্থ থাকলে এই কাজগুলো ঠিকঠাক করতে পারবে,ফলে আমরা সুস্থ থাকবো।কিন্তু লিভার যদি কোনরকমভাবে অসুস্থ হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়,তাহলে লিভারের কাজ ব্যাহত হবে,যা আমাদের শরীরে অসুস্থতা ডেকে আনবে, যা আমাদের কাছে মোটেই কাম্য নয়।
তাই লিভারকে সুস্থ রাখার জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে, এবং লিভার যদি কোনরকমভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে তা সারানোর জন্য আমাদের সর্বান্তকরণে চেষ্টা করতে হবে।
,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
লিভারের অসুস্থতা
লিভার বিভিন্ন রকমভাবে অসুস্থ হতে পারে-১. ভাইরাসের আক্রমণে- হেপাটাইটিস-এ,হেপাটাইটিস বি,বা হেপাটাইটিস সি হতে পারে।
২. কিছু ওষুধ (যেমন,acetaminophen combination medication,যেমন, Tylenol,Panadol,Vicodin, Lortab,Norco.
Statins, Niacin {prescribe to control elevated blood levels of cholesterol.}
কিছু Antibiotics,
Excessive amount of Vitamin A,kava kava,ma-huang,comfrey.ইত্যাদি লিভারের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
কিছু মাশরুম লিভারে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।
মদ বা বিষক্রিয়ার ফলে লিভারের অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।এ থেকে ফ্যাটি লিভার, মানে লিভারে ফ্যাট জমা ও লিভার সিরোসিসের মতো রোগ হতে পারে।
অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারের কোষের উপর ফ্যাট জমে লিভার কোষের কার্যকারিতা নষ্ট করে।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সরাসরি লিভার কোষকে আক্রমণ করে। লিভার সিরোসিস হল লিভারের অসুস্থতার শেষ ধাপ।এই পর্যায়ে লিভারে ক্ষত সৃষ্টি হয়,লিভার কোষগুলি কার্যকারিতা হারায়,ফলে লিভার ফেল করে।
৩. লিভার ক্যান্সার একটা মারাত্মক রোগ।
৪. এছাড়া হেমোক্রোমাটিস বা উইলসন ডিজিজের মতো কিছু বংশগত রোগের দ্বারাও লিভার আক্রান্ত হতে পারে।
,,,,,,,,,,
উপসর্গ
লিভারের অসুস্থতায় শরীরে বিভিন্ন রকমের উপসর্গ দেখা যায়, মানুষ হিসেবে উপসর্গে হেরফেরও হয়।সেই উপসর্গগুলির মধ্যে পা ফোলা ও অ্যাবডোমেন(পাঁজরের ঠিক নিচের অংশ) ফুলতে পারে।মলমূত্রের রঙ পাল্টে যেতে পারে,জন্ডিস হতে পারে ,শরীরের ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যেতে পারে,বা কখনো কখনো কোন উপসর্গই প্রকাশ পায় না।
ইমাজিং টেস্ট,লিভার ফাংশান টেস্টের মাধ্যমে লিভারের অসুস্থতা পরীক্ষা করা যায় ও কোন রোগ হলে তা চিহ্নিত করা যায়।
পড়ুন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আরও পোস্ট>>
লিভারকে সুস্থ রাখতে হলে
১. মদ্যপান না করাই ভালো, করলেও পরিমিত করতে হবে।তবে লিভারের সমস্যা থাকলে একদমই না।২. ওষুধ খাওয়ার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।প্রয়োজনে ডাক্তার এর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
৩. খাদ্য ও জল খাবার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।কারণ, হেপাটাইটিস এ এর ভাইরাস খাদ্য ও জলের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়।
৪. মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও যৌন জীবনের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।কারণ,হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি এর ভাইরাস রক্ত ও দেহরসের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়।
৫. হাইপ্রোটিন জাতীয় ও আজেবাজে খাবার লিভারের উপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে।তাই এসব খাবারের বেলায় সংযমী হতে হবে।
ফলমূল ও শাকসবজি বেশি খাওয়ার চেষ্টা করুন।
চা,কফি,আঙুর,গাজর লিভারের জন্য খুব উপকারী।
লেবু,রসুন,আপেল,বাদাম,ফ্যাট যুক্ত মাছ খান।
পরিমিত আহার করুন।
পরিমিত জল খান।
নিয়মিত ও পরিমিত শরীর চর্চা করুন।
ঘুমের দিকে বিশেষ ভাবে নজর দিন।পরিমিত ঘুম লিভার কে ভালো রাখে।রাত্রের খাবার ঘুমোতে যাবার অনেক আগে খেয়ে নিন।
সংযমী জীবনযাপন লিভারকে সুস্থ রাখবে, আপনাকেও।



1 টি মন্তব্য:
লিভার ভালো রাখার ৫ টি টিপসঃ
(১) সার্বজনীনভাবে হেপাটাইটিস বি সনাক্তকরণ পরীক্ষা করে নিতে হবে এবং এই ভাইরাস প্রতিরোধী টিকা নিতে হবে
(২) প্রত্যহ নিয়মিত শারীরিক ব্যয়াম করা,
(৩) খাবার
(৪) নিরাপদ যৌন চর্চায় অভ্যস্ত হওয়া,
(৫) ৪০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে সবাইকে আলট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasonography) করে দেখে নিতে হবে - লিভার, গলব্লাডার, বাইল ডাক্ট ও প্যানক্রিয়াসে কোন উপসর্গবিহীন টিউমার বা চাকা আছে কি না।
বিস্তারিত জানতে, Dr Sayedul Haque Jewel
সহকারী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ,
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
চীফ কনসালট্যান্ট, ঢাকা গ্যাস্ট্রো-লিভার সেন্টার।
০১৭০৩-৭২৮৬০১
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন