বিমলা - (বিকেলে কাজ থেকে ফিরে) মালতী, ও মালতী (কেউ সাড়া দেয় না। বাড়িতে কেউ নেই দেখে অগত্যা সে দাওয়ায় গিয়ে বসলো। শাড়ীর আঁচল খুলে মুখ ঘাড় মুছলো, বারান্দার কোনায় রাখা কলসি থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে বারান্দায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। এর মধ্যেই স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুল থেকে ফিরল পিঙ্কি ও রিঙ্কি। দিদিমাকে ওরকম শুয়ে থাকতে দেখে বড় বোন পিংকি দিদিমাকে ডেকে বলল-)
পিংকি - দিদিমা (ডাক শুনে মালা উঠে বসলো) ওরকম ভাবে শুয়ে আছো কেন ? (কিন্তু কোনো কথা বলল না বিমলা, পরে মুখটা সামান্য অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল)
দিদিমা - তোর কি মনে হচ্ছে যে আমি স্বর্গ থেকে ফিরলাম ?
রিঙ্কি - আমি তো তোমাকে ভালোভাবে বললাম দিদিমা ওরকম রাগ করছ কেন ?
দিদিমা - রাগ করবো না তো কি আহ্লাদে নাচবো ? পিংকি - মা মা (কোন সাড়া না পেয়ে দিদিমার দিকে তাকিয়ে) মা কোথায় দিদিমা?
দিদিমা - তোর মা কোথায় তা আমি কি করে বলবো ? রোদ থেকে ফিরে এসে এক গ্লাস জল পর্যন্ত নিজে ঢেলে খেতে হচ্ছে ! (চিৎকার সহকারে)
(মায়ের প্রবেশ)
মালতি - কি গো মা, কি হলো ? অত চেঁচাচ্ছো কেন ?
দিদিমা - (ব্যঙ্গ করে) কি গো, কি হলো ? অত চেঁচাচ্ছি কেন ?
মালতি - ও মা, ও কি গো ?
দিদিমা - (ঘাড় ফুলিয়ে ব্যঙ্গ করে ব্যঙ্গাত্মক সুরে)
ও মা, ও কি গো ? বলি গেছিলি কোথায় ?
মালতি - মেয়ে দুটো এখন বড় হয়েছে, অতো বড় বড় মেয়ে দুটোর সামনে তুমি আমার সঙ্গে এই ব্যবহার করছ ? তোমার কি একটুও কান্ডজ্ঞান নেই ?
(পিঙ্কি রিংকি বেরিয়ে যায়)
দিদিমা - আমার কান্ডজ্ঞান নেই, না ? আর তোর বুঝি খুব আছে?
মালতি - কেন আমি কান্ডজ্ঞান না থাকার কি কাজ করেছি ?
দিদিমা - সারাদিন রোদে পুড়ে মাল ফেরি করতে কেমন লাগে তা জানিস ? সকালে পান্তা ভাত খেয়ে বেরিয়েছি। আর কি টিফিন দিয়েছিস তুই আমাকে ? শুধু নুন ভাত ? একটা কাঁচালঙ্কা পর্যন্তও নেই !
মালতী - কাঁচালঙ্কা থাকলে তো দেব।
দিদিমা - থাকলে মানে ? কেন নেই ?
মালতি - না। তুমি কি বাজার থেকে এনেছো যে থাকবে ?
দিদিমা - ওরে বাজার থেকে আনবো, না ? বাজারে কাঁচা লঙ্কার কত দাম তা জানিস ? ১৪০ টাকা কেজি। কেন , ঘরের পিছনে যে দুটো গাছ ছিল ? মালতি - সে যে বন্যার জল উঠে মরে গেছে তা তুমি জানো না ?
দিদিমা - (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) এই আর এক বন্যা ! সব ধ্বংস করে দিলো। সব নষ্ট করে দিলো। (মালতীর দিকে আঙ্গুল তুলে) এই এই শোন, বলছিলি না, মেয়ে দুটো বড় হয়ে গেছে ? ওদের বিয়ে দিয়ে দিতে হবে।
মালতি - মেয়ে দুটো সবে নাইন-টেনে উঠলো, বড় মেয়েটা এবার মাধ্যমিক দেবে। আর তুমি বলছো ওদের বিয়ে দিয়ে দিতে হবে ?
দিদিমা - হ্যাঁ, দিতে হবে।
মালতি - ওরা বিয়ে করবে না। আমিও বলেছিলাম ওদের। কিন্তু ওরা বিয়ে করতে চায় না। ওরা দুজনেই বলেছে যে, ওরা আরও লেখাপড়া করবে, বিএ, এমএ পাস করবে।
দিদিমা - মেয়েছেলে বিএ এমএ পাস করে হবে কি রে ? দুদিন পরে সংসার চলবে কি করে তার ঠিক নেই, আর আমরা ওদের বিএ এমএ পড়াবো কি দিয়ে রে ?
মালতি - আমিও তো বিড়ি বাঁধছি, লোকের বাড়ি কাজ করছি, আমিও তো কিছু ইনকাম করছি।
দিদিমা - আমাদের এই ইনকাম দিয়ে হবে কি রে ? আর ওদের অতদূর লেখাপড়া শিখিয়েই বা হবে কি ? ওরা তো চলে যাবে পরের ঘরে। ওরা কি আমাদের কামাই করে খাওয়াবে ? এখন ওদের লেখাপড়া শিখিয়ে যদি হাত খালি করে ফেলি, ওরা তো দুদিন পরে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে, তারপর বুড়ো বয়সে খাবি কি তা ভেবে দেখেছিস ?
মালতি - তা আমিও তো বলেছিলাম, ওরা রাজি হয়নি।
দিদিমা - রাজি হয়নি বললে হবে ? আবার বল, রাজি করা। মেয়েছেলে তো আর ঘরে পুষে রাখা যায় না। বিয়ে তো ওদের দিতেই হবে।
(পিংকি ও রিংকি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে)
পিংকি - (কোমরে দুহাত রেখে) দিদিমা, আমাদেরকে তোমাদের পুষতে হবে না। আমাদের ভরণপোষণও তোমাদের করতে হবে না। বিয়ে দেবার কথাও ভাবতে হবে না। আমাদের চিন্তা তোমাদের করতে হবে না।
রিংকি - আমাদের পথ আমরা দেখে নেবো।
দিদিমা - তোদের পথ তোরা দেখে নিবি ?
রিঙ্কি - হ্যাঁ
পিংকি - হ্যাঁ
দিদিমা - কি করে দেখবি শুনি।
মালতি - নাতনিদের সঙ্গে ঝগড়া কোরো না, যাও, গা-টা ধুয়ে নাও। আর পিঙ্কি রিংকি, তোরা দিদিমার সঙ্গে ওরকম বড় মুখে তর্ক করিস নে।যা এখন একটু ঘুরে আয়। তোর দিদিমা কাজ থেকে কষ্ট করে এসেছে, তার সাথে তর্ক করিস নে।
(বিমলা গামছাটা কাঁধে নিয়ে গা ধুতে যায়)
পিংকি - তর্ক আমরা করছি নে, মা। তবে বিয়েও আমরা করছি না। কি রে রিঙ্কি, তুই কি বলিস ?
রিংকি - হাঁ মা, বিয়ে আমরা করছি নে। তাছাড়া আমরা এখন নাবালিকা, আমাদের এখন বিয়ে করা উচিত না। তোমাদের ও সে চেষ্টা করা উচিত না। কারণ, আইন মতে ১৮ বছরের আগে কোন মেয়েকে বিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
মালতি - উচিত নয় বললে হবে মা ? সরকার তো আইন করে বসে থাকে। কিন্তু তারা কি আমাদের কথা একটু ভেবে দেখে যে, আমাদের মতো গরিব মানুষ কি করে এইসব আইন-কানুন মেনে চলবে ? তোরা একবার ভেবে দেখ তো, আমাদের পক্ষে কি সম্ভব ?
পিঙ্কি - সে জানি মা, সে বুঝি। কিন্তু মনে জোর নিয়ে যদি কঠোর পরিশ্রম করা যায়, তাহলে অভাবের মধ্য দিয়েও সফল হওয়া সম্ভব। মনের জোর আর কঠোর পরিশ্রম, এই দুটোই এখন আমাদের একমাত্র মূলধন। এদুটোকেই সম্বল ক'রে আমাদের এগোতে হবে। হিমা দাস, স্বপ্না বর্মণেরা যদি পারেন, তো আমরা পারব না কেন ?
মালতি - হিমা দাস, স্বপ্না বর্মণ - এরা আবার কারা ? পিঙ্কি - এরা হলেন এথলিট,মানে খেলোয়াড়, খেলাধুলা করেন। এরাও আমাদের মতো গরীব ঘরের মেয়ে।কিন্তু অভাবের কাছে হার না মেনে এরা কঠোর জীবনসংগ্রাম ক'রে আজ সাফল্যের শিখরে উঠেছেন। খেলাধুলায় কৃতিত্ব দেখিয়ে সমগ্র দুনিয়ার সামনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তাই আমরা মেয়ে ব'লে আমাদের বোঝা মনে করার কোন কারণ নেই। শোন মা, আমিও এখন চেষ্টা করবো কিছু ইনকাম করতে। কারণ, বোনকে লেখাপড়া শেখাতেই হবে।
রিঙ্কি - না দিদি, শোন, আমার কথা তোকে ভাবতে হবে না। তুই পড়াশুনায় মন দে। সামনে তোর মাধ্যমিক পরীক্ষা। আমি না হয় মায়ের সাথে বিড়ি বেঁধে দেবো।
মালতি - (কপাল চাপড়ে) হা আমার পোড়া কপাল ! তুই আমার সাথে বিড়ি বাঁধবি ? হায় রে, হায় হায়, আজ আমাকে এই কথা শুনতে হতো না যদি আমার একটা ছেলে থাকতো। একটা ছেলে হলো না বলে তোর বাবা আমাকে মেরেধরে নির্যাতন ক'রে তাড়িয়ে দিলো। তোদের বাবা মনে করত, আমার বদলে সে যদি অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করতো, তাহলে সে ছেলের বাবা হতে পারতো। আর এর জন্য সে আমাকে দায়ী ক'রে তাড়িয়ে দিলো। ভাগ্যিস, মাথা গোঁজার জন্য বাবা এই ভিটেমাটিটুকু রেখে গেছেন, তাই এখনো টিকে আছি। নইলে কি যে হতো ! খালি কষ্ট হয় এই বুড়ো মা টা কে নিয়ে। বুড়ো বয়সেও তাকে এইভাবে কষ্ট করতে হচ্ছে।
পিংকি - তোমাদের এ ধারণা পুরো ভুল মা।
মালতী - কোন ধারণা ?
পিঙ্কি - পুত্র সন্তান হবে, না কন্যা সন্তান হবে, তার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী বাবারা, মায়েরা নয়।
মালতি - একথা তোরে কে বলল ?
রিংকী - এ কথা মা আমরা বই পড়ে জেনেছি। আমাদের বইয়েই লেখা আছে একথা।
মালতি - তাই ? তোরা ঠিক বলছিস ? তাহলে তোরা ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়েছিস এর জন্য আমি দায়ী নই ? তোর বাবা দায়ী ?
পিঙ্কি - হ্যাঁ, এটা ক্রোমোজোমের হিসেবের ব্যাপার। আর আমরা ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়েছি এটাও কোন দোষ বা অপরাধ নয়। আর তার জন্য তুমিও অপরাধী বা দোষী নও মা।
রিঙ্কি - এর জন্য একমাত্র দায়ী বা দোষী আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থা। কারণ, এই ভ্রান্ত সমাজ ব্যবস্থাই আমাদের এভাবে ভ্রান্ত ভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। মালতি - তুই ঠিক বলেছিস রিঙ্কি। আমারও মাঝে মাঝে তাই মনে হয়, আমাদের সমাজে বাবা-মা পুত্র সন্তানের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের মতো, যাদের পুত্র সন্তান নেই, আবার বুড়ো বয়সে জীবন নির্বাহের ভালো কোনো উপায়ও নেই, সরকার এত আইন করে, আমাদের মত মানুষের জন্য যদি একটা আইন করতো, যদি একটা মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করতো।
পিঙ্কি - তাহলে তো খুব ভালোই হতো মা। কিন্তু তুমি চিন্তা কোরোনা। আমাদের উপর ভরসা রাখো। আমরাই তোমাদের দুজনকে দেখবো।
রিংকি - হাঁ মা, তুমি চিন্তা কোরোনা। আমরা লেখাপড়া শিখে নিজেদের পায়ে দাঁড়াবোই দাঁড়াবো। আর তখন তোমাদেরও দায়িত্ব নিতে পারবো।
মালতী - আয় মা, তোরা বুকে আয় আমার।
(দুই বোন মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে)
![]() |
| এই সেই পুরস্কার জয়ী ট্রফি |





কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন