শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৯

এনআরসি কেন গ্রহণযোগ্য নয় Why NRC not acceptable

NRC বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি যেভাবে তৈরি করা হচ্ছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।কারণ রাষ্ট্রের শাসকদের ভুলভ্রান্তি, অজ্ঞতা ও অপদার্থতার সমাধান সাধারণ মানুষের জীবন বলি বিয়ে হতে পারে না।
Why NRC not acceptable
Detention Camp
দেশভাগ হল, লোকভাগ হলো না। এর ফলে সাম্প্রদায়িকতার উপর ভিত্তি ক'রে গঠিত পাকিস্তানে যে সব অমুসলিম জনতা থেকে গেল তাদের প্রতি অবিচার করা হলো, তাদেরকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হলো। কারণ তারা দেশভাগ চায়নি, তারা পাকিস্তানও চায়নি। তারা চেয়েছিল স্বাধীনতা- পাকিস্তানের স্বাধীনতা নয়, ভারতের স্বাধীনতা। অথচ, দেশভাগের দ্বারা তাদেরকে সেই ভারত থেকেই বিচ্ছিন্ন করা হলো।
তারা চেয়েছিল স্বাধীনতা, লড়াই করেছিল স্বাধীনতার জন্য। অথচ তাদের বানিয়ে দেওয়া হলো ভারতের শত্রু পাকিস্তানের নাগরিক। তারা চেয়েছিল মধু, তার বদলে পেলো কদু, যাতে শুধু গলাই চুলকায়। হ্যাঁ, গলা তাদের ভালোমতোই চুলকাচ্ছে। সম্প্রদায়িক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হতে হতে পাকিস্তানে তারা আজ বিলুপ্তপ্রায়, যে কয়জন এখনো সেদেশে টিকে আছে কোনোমতে তাদের অস্তিত্বও আজ বিপন্নপ্রায়। ফলে স্বাধীনতার বদলে তারা পেল সাম্প্রদায়িক শক্তির অধীনতা, সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে তারা আজ জিম্মি
আর এর জন্য দায়ী সেই সময়কার অর্থাৎ দেশভাগের সময়কার ভারতীয় নেতৃত্ব। কারণ দেশ ভাগ হওয়ার পরেও তারা লোকবিনিময় করেনি।তাদের উচিত ছিল লোকবিনিময় ক'রে পাকিস্তানের অমুসলিমদের ভারতে নিয়ে আসা এবং ভারতের মুসলিমদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া। তাহলে হিন্দুরাও ভালো থাকতো আর মুসলিমরাও ভালো থাকতো,বা হয়তো এমনও হতে পারতো যে, দেশভাগের শর্ত হিসেবে লোকবিনিময়কে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে রাখা হলে দেশভাগের জন্য যারা দাঙ্গা-হাঙ্গামা করেছে তাদের অনেকেই হয়তো দেশভাগের বিরোধিতা করতো,বা ভারতের মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী মুসলিমরাও দেশভাগের বিরোধিতা করতো। ফলে দেশটাই হয়তো আর ভাগ হতো না। তাই তখনকার নেতৃত্বের সীমাহীন বোকামি ও অদূরদর্শিতার মূল্য সাধারণ মানুষের জীবনের বিপন্নতা দিয়ে চোকানো কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

লোকবিনিময় যেহেতু করা হয়নি, তাই দেশভাগের বলি এই মানুষগুলোর জন্য অবশ্যই বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত। তার সেই বিকল্প ব্যবস্থা হওয়া উচিত, যতদিন তারা পাকিস্থানে (পশ্চিম বা পূর্বপাকিস্তানে) থাকতে পারে থাকুক, কিন্তু যখন আর পাকিস্তানে থাকা সম্ভব হবে না তখন ভারতে এসে আশ্রয় নিলে সঙ্গে সঙ্গে তারা ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। তাহলেই দেশভাগের বলি এই মানুষগুলোর প্রতি প্রকৃত সুবিচার করা হবে।
(এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, জিন্নাহ  কিন্তু লোকবিনিময়ে রাজী ছিলেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহেরু রাজি হননি। ফলে দোষ সেই সময়কার ভারতীয় নেতৃত্বের।)
কিন্তু তার বদলে কি করা হচ্ছে ? তার বদলে তাদের শরণার্থী বানানোর চেষ্টা হচ্ছে। এনআরসি ক'রে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। নাগরিক থেকে তাদের পরিণত করা হচ্ছে শরণার্থীতে
             এটা গেল দেশভাগের বলি মানুষগুলোর কথা। কিন্তু যারা দেশভাগের বলি নয়, যারা দেশভাগের পরেও ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে রয়ে গেছে, এনআরসি কি তাদের সঙ্গেও সুবিচার করবে ? তার উত্তর হল - না।
অসমে যে এনআরসি হয়েছে তাতে খোদ অসমীয়া ভূমিপুত্ররা এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। সেইসঙ্গে বাদ পড়েছে এক লক্ষ আদিবাসী জনজাতির লোক। কারণ, তারা উপযুক্ত কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ তুমি এ দেশের অধিবাসী কি অধিবাসী নাও সেটা বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে তোমার কাগজ আছে কি নেই। দেখা যাচ্ছে, কাগজ দেখিয়ে বা অন্য কোন উপায়ে অনেক বিদেশি নাগরিকও এনআরসি তালিকাতে নাম তুলে নিয়েছে। আবার এমনও দেখা যাচ্ছে, কাগজপত্র আছে, এ দেশের অধিবাসী, কিন্তু তা সত্বেও তাদের নাম এনআরসি তালিকাতে ওঠেনি। কারণ, অফিসারেরা তাদের নাম তোলার জন্য তাদের কাছে টাকা চেয়েছে।কিন্তু তারা টাকা না দেওয়াতে তাদের নাম এনআরসি তালিকাতে ওঠেনি। অর্থাৎ, বিষয়টা হচ্ছে - টাকা দাও, নাগরিকত্ব নাও; টাকা না দিলে নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এনআরসি প্রক্রিয়া ঘুষ খাওয়ার একটা ভালো উপায়। মানুষকে শোষন করার হাতিয়ার হিসাবে এনআরসিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সমস্ত দেশজুড়ে এনআরসি প্রক্রিয়া চালু হলে এই শোষণ প্রক্রিয়া আরো প্রসারিত হবে। নাগরিকত্ব যেহেতু যেকোনো মানুষের কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই নাগরিকত্বের জন্য মানুষ টাকা দিতে বাধ্য হবে, যদি অফিসারেরা এ ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করে। প্রচুর মানুষ রয়েছে যাদের উপযুক্ত কাগজপত্র নেই বা ছিল কিন্তু হারিয়ে গেছে বা বন্যার জলে ভেসে গেছে, তারা পড়বে সবচেয়ে বিপদে। অফিসারেরা তখন তাদের শোষণ করার সুযোগ পাবে। ধরা যাক, পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার। অফিসারেরা চেয়ে বসলেন মাথাপ্রতি 3 লাখ 4 লাখ বা 5 লাখ টাকা ক'রে। তার বদলে নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন, এনআরসিতে নাম তুলে দেওয়া হবে। তখন টাকা দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে তারা এনআরসি তালিকা থেকে বাদ যাবে। বাকি জীবন কাটবে ডিটেনশন ক্যাম্পে না খেয়ে খেয়ে। বাকি জীবনটা ধুঁকে ধুঁকে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে তিলে তিলে।
আর যাদের টাকা আছে তাদের এক কাড়ি টাকা (১২ লাখ, বা ১৫ লাখ বা ২০ লাখ) খুইয়ে নাগরিকত্ব পেতে হবে। সারা জীবনের সঞ্চয় খাওয়াতে হবে। নতুবা জমি বাড়ি বিক্রি ক'রে নিঃস্ব পথের ভিখারীতে পরিণত হতে হবে - শুধুমাত্র এনআরসি তালিকাতে নাম তোলার জন্য। তাই এনআরসি প্রক্রিয়া মানুষকে শোষণ ক'রে সর্বহারাতে পরিণত করার একটা সুচতুর কৌশলমাত্র। অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে মানুষকে শোষন করার এই কৌশল আবিষ্কার করা হয়েছে।
আর এই কৌশলের শিকার হবে যাদের উপযুক্ত কাগজপত্র নেই তারা। সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সম্ভবত আদিবাসীরা। কারণ, তারা অত বেশি সচেতন নয় এবং জমি জায়গা কাগজপত্রের অভাব রয়েছে তাদের। ফলে তাদের উৎখাত করতেও সুবিধা হবে। এছাড়াও রয়েছে প্রচুর সাধারণ মানুষ, যারা ভূমিহীন বা যারা কাগজপত্র গুছিয়ে রাখেনি। কারণ কাগজ পত্রের গুরুত্ব তারা কখনো ভেবে দেখেনি। কারণ তা ভেবে দেখার প্রয়োজন পড়েনি। এছাড়া যাযাবর সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন, বেদেরা, যাদের কোনো স্থায়ী বাসস্থান বা জমি জায়গা নেই, নেই কোনো কাগজপত্র, তাদের জীবন হবে বিপন্ন। বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতবর্ষের বহুমাত্রিক জনজাতির বহুমাত্রিক আত্মপরিচয় বোঝার চেষ্টা না ক'রে এই ধরনের উদ্ভট প্রক্রিয়া ভারতীয় জনজাতিসমূহের নাগরিক আত্মপরিচয় তথা জাতীয় সত্তাকে বিপন্ন করবে।
পড়ুন >> শীতের স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার প্রতিকার

কোন মন্তব্য নেই:

Featured post

শীতের স্বাস্থ্য-সমস্যা ও তার প্রতিকার How to heal the health problems of Winter season

শীতে পরুন গরম পোশাক শীত একটি সুন্দর মনোরম ঋতু।কিন্তু শীতকাল অনেকের কাছেই খুব সমস্যার, বিশেষ করে যাদের ঠান্ডার ধাত বা অ্যাজমা ইত‍্যাদি...