শনিবার, ১১ মে, ২০১৯

ধর্মের সাথে দেশভাগের পথে

ধর্মের জন‍্য দেশভাগ

With the religion to the way of partition

দেশভাগ আর ধর্ম পরস্পরের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। ধর্ম বলতে ইসলাম ধর্ম। হ‍্যাঁ, নির্দিষ্ট করে বলতে হলে ইসলাম ধর্মের কথাই বলতে হয়। কেবলমাত্র ইসলাম ধর্মের জন‍্যই দেশ ভাগ হয়েছিল।ভারতবর্ষে আরো অনেক ধর্ম ছিল,কিন্তু ইসলাম ভিন্ন আর কোন ধর্মের অনুগামীরাই দেশভাগের দাবী তোলেনি। কেবলমাত্র ইসলাম অনুগামীদেরই মনে হয়েছিল
দেশটাকে ভাগ করে মুসলমানদের জন‍্য আলাদা রাষ্ট্র হাসিল করতে না পারলে অবিভক্ত ভারতে মুসলিমদের অধিকার বা আধিপত্য সুনিশ্চিত বা সুরক্ষিত হবে না।ইসলাম ভিন্ন অন‍্য কোন ধর্মের অনুগামীদের মনে এরকম চিন্তা আসেনি।অর্থাৎ, এটা স্পষ্ট যে,মুসলিমেরা নিজেদেরকে ভারতরাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্ম মনে করেনি।তারা নিজেদেরকে ভারতীয় সত্তার থেকে আলাদা সত্তা বা আলাদা জাতি হিসেবে বিবেচনা করে।আর এই আলাদা জাতিসত্তাবোধের উপর দাঁড়িয়ে তারা আলাদা রাষ্ট্রের দাবী জানায়।
আর তাদের দাবীর উপর ভিত্তি করে তাদের পৃথক রাষ্ট্রের দাবিকে কার্যকরী করার জন‍্য তারা শুরু করে জেহাদ, যার ধারা এখনো বহমান, পাকিস্তান কায়েম করার পরেও।

দেশভাগের পক্ষে বিপক্ষে


দেশভাগ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টার ফসল নয়।স্বতঃস্ফূর্তভাবে এদেশের জনতা দেশভাগের দাবি জানায়নি,বা দেশভাগের প্রস্তাবকে সমর্থন জানায়নি।শুধু জনগণ কেন,সর্বসম্প্রদায়ের আপামর নেতৃত্বও দেশভাগের উদ‍্যোগে আগ্রহ দেখায়নি,সেটা ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফল দেখেই বোঝা যায়।কেবলমাত্র বাংলা ছাড়া আর কোন প্রদেশের জনতা দেশভাগের পক্ষে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে নি।কেবল বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অপব‍্যবহার করে জিন্না সুরাওয়ার্দীর প্রচেষ্টায় দাঙ্গা বাধিয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলে সারা দেশ জুড়ে জনতার মধ্যে সাম্প্রদায়িক ফাটল তৈরি করতে সমর্থ হয়,এবং সেই ফাটলের সদ্ব‍্যবহার করে দেশকে রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়।
অর্থাৎ,এখানে দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় আবেগের কাছে জাতীয় সংহতি ও  জাতীয়তার আবেগ পরাস্ত হয়েছে।
এইজন‍্য ধর্ম নিয়ে বিশেষ করে ভাবনার প্রয়োজন এখনো রয়েছে, কারণ,ধর্মীয় আবেগ মানুষের মধ্যে এখনো সমানভাবে আছে।ফলে ধর্মের দ্বারা জাতীয় সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা এখনো সমানভাবে আছে।
তাই ধর্ম নিয়ে বিশেষ ভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে, এবং রাষ্ট্রকে তা করতে হবে,ধর্মের বিষ থেকে রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখার যাবতীয় রাষ্ট্রনৈতিক পদক্ষেপ রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।
আর সেই পদক্ষেপের মূল লক্ষ‍্যই হতে হবে ধর্মের বিষদাঁত চিরদিনের জন‍্য উপড়ে ফেলা।
একাজ মোটেই কঠিন নয়,খুবই সহজ।
কেবল কিছু প্রশাসনিক উদ্যোগ ও শিক্ষাব‍্যবস্থার সংস্কারের মাধ‍্যমে খুব সহজেই এ কাজ করা যায়।
India before Independence, 1946
স্বাধীনতার পূর্বের ভারত(১৯৪৬)


আলী জিন্না ও দ্বিজাতি তত্ত্ব


ভারতের রাজনীতিতে দ্বিজাতি তত্ত্বকে বাস্তবে রূপায়িত করেন মহম্মদ আলি জিন্না, যার ফলশ্রুতিতে দেশভাগ ১৯৪৭ এ। এই দ্বিজাতি তত্ত্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ধর্মীয় পরিচয়কে ভিত্তি করে।এই তত্ত্ব বলে, হিন্দু ও মুসলিম দুটি আলাদা জাতি।অথচ,জিন্না মোটেই ধর্মাসক্ত ছিলেন না।নিষ্ঠাবান মুসলিমের মতো নামাজ রোজা করতেন না,উল্টে মদ‍্যপান করতেন, বিলাতী কেতায় জীবন কাটাতেন,ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষা দীক্ষা ধ‍্যানধারণার অনুগামী।ধর্মীয় সংকীর্ণতাও তার মধ্যে ছিল না।তিনি ছিলেন আধুনিক চিন্তাভাবনায় বিশ্বাসী একজন আধুনিক মনস্ক মানুষ। অথচ সেই তিনিই ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতা,ধর্মীয় মৌলবাদ ও দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রধান মুখ হয়ে উঠলেন।যার ফলে ভারতের জাতীয় রাজনীতি নতুন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করলো।কিভাবে হল এমনটা ?
জিন্না তো আগে কংগ্রেস রাজনীতিতেই ছিলেন।কিন্তু গান্ধীজির প‍্যানপেনে আন্দোলনের নীতি তার ভালো লাগেনি।এই ধরনের আন্দোলনের মধ্যে তিনি কোন সাফল্যের সম্ভাবনার আশা দেখতে পারেননি, অথচ কংগ্রেসে গান্ধীজির মতবাদই গ্রহণযোগ্যতা পেল দেখে তিনি জাতীয় আন্দোলন সম্পর্কে হতাশ হয়ে লন্ডনে গিয়ে আয়েশে বিলাতী কেতায় জীবন কাটাতে লাগলেন।

সেই বিলাতে গিয়ে লিয়াকত আলী জিন্নার সঙ্গে দেখা করে তাকে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন‍্য অনুরোধ করলেন, এবং সারাজীবনের জন‍্য তাকে মুসলিম লীগের সভাপতি রাখা এই শর্তে তাকে রাজীও করালেন।জিন্নার মনে আবার নতুন সম্ভাবনার আশা অঙ্কুরিত হল। তিনি ভারতে ফিরে এলেন,এবং মুসলিম লীগের রাজনীতি শুরু করে দিলেন, যা তিনি কখনো বিশ্বাস করতেন না,নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার জন‍্য সেই ভন্ডামির আশ্রয় নিলেন। ব‍্যক্তিগতভাবে ব‍্যক্তিগত জীবনে তার কাছে ধর্মের কোন গুরুত্ব না থাকলে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে ধর্ম যে তার জন‍্য একটা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে তা বুঝতে তিনি ভুল করলেন না।তাই ব‍্যক্তিগতভাবে ধর্মে বিশ্বাস না করলেও রাজনৈতিক কৌশল বা অস্ত্র হিসেবে তিনি ধর্মকে ব‍্যবহার ক'রে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে তৎপর হয়ে উঠলেন।যার বিষময় পরিণতিই হল দেশভাগ।অর্থাৎ, ধর্ম এখানে ধার্মিকের দ্বারা নয়,বরং,একজন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ধর্মে অবিশ্বাসী ধূর্ত কৌশলী রাজনীতিকের দ্বারা ব‍্যবহৃত হয়েই ভয়ংকর ধ্বংসসাধন করতে সক্ষম হলো।
জিন্না যেহেতু ধার্মিক ছিলেন না,অথচ তিনি ধর্মের জিগির তুলে রাজনীতি করলেন, যা তিনি নিজে বিশ্বাস করেন না সেই বিশ্বাসকে ব‍্যবহার করলেন জনমতকে প্রভাবিত করার জন‍্য,তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন‍্য।তিনি ধর্মান্ধতাকে উস্কে দিয়ে ধর্মান্ধদের ক্ষেপিয়ে তুললেন কেবল তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার রাস্তা পরিস্কার করার জন‍্য।আর সাফল্যের সঙ্গেই তিনি সে কাজ করতে সক্ষম হলেন।
A special Refugee train at Sambala station
আম্বালা স্টেশনে স্পেশাল রিফিউজি ট্রেন

হাতিয়ার যখন ধর্ম

ধর্মকে জিন্না এখানে তার রাজনৈতিক সাফল‍্যলাভের, রাজনৈতিক লক্ষ‍্যপূরণের  চাবিকাঠি হিসেবে ব‍্যবহার করলেন।ধর্মের মধ‍্য দিয়ে তিনি ধর্মীয় সিদ্ধিলাভ করতে চাননি,চেয়েছেন রাজনৈতিক সিদ্ধি লাভ করতে।রাজনৈতিক সিদ্ধিলাভের জন‍্য ধর্ম কেন ? কারণ,মানুষ রাজনীতি বোঝে না, বোঝে ধর্ম,মানে ধর্মকে, প্রভাবিত হয় ধর্মের দ্বারা।এটা হল মাছ শিকারের মতো ব‍্যাপার।মাছ শিকারী বড়শিতে নিজের পছন্দের খাবার না গেঁথে টোপ হিসেবে যেমন মাছের খাবার গাঁথেন,যা তিনি নিজে খান না,কারণ,তাতেই মাছেরা আকৃষ্ট হয় এবং টোপ গেলে।জিন্নাও করলেন ঠিক তাই, তিনি নিজে ধর্মে বিশ্বাস করেন না,কিন্তু জনগণ করে,তাই তিনি জনগণের ধর্মবিশ্বাসকে এখানে টোপ হিসেবে ব‍্যবহার করলেন, এবং নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করলেন।

তাহলে দেখা গেল, জনতার ধর্মবিশ্বাসই দেশটাকে ভাগ করে দিল।জনতার ধর্মবিশ্বাস না থাকলে ধর্মের আবেগ ও উস্কানিতে জনতাকে চালিত করা সম্ভব হত না,ফলে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করাও সম্ভব হত না,বা দেশভাগ হত না।যার দ্বারা মানুষকে প্রভাবিত ও চালিত করা যাবে নীতিহীন ক্ষমতালোলুপ নেতারা জনগণের উপর নিজের নেতৃত্বের প্রভাব বিস্তার করার জন‍্য সেই উপকরণটাকেই ব‍্যবহার করবে,জিন্না সেই কাজটাই করেছেন।মৌলানা আজাদ কিন্তু তা করতে যাননি,মৌলানা আজাদ হেঁটেছেন উল্টো পথে,ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পথে।কিন্তু মুসলিমরা বেছে নিলো জিন্নাকে।
Refugees at a camp
একটি রিফিউজি ক‍্যাম্পের দৃশ‍্য


দড়ি টানাটানি

মুসলিমরা জিন্নাকে বেছে নিল একথাও পুরোপুরি ঠিক নয়। কারণ ? জিন্না পাকিস্তানের জন‍্য চেঁচামেচি করছিলেন অনেকদিন ধরে।কিন্তু মুসলিমদের কাছ থেকে কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পাননি।১৯৩৫ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত সংঘটিত নির্বাচনগুলিই তার প্রমাণ।মুসলমানরাও মুসলিম লীগের পক্ষে তেমন ভোট দেয়নি। তাই তো দেখি মুসলমান প্রধান উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে লীগবিরোধী খান আব্দুল গফফর খান,পাঞ্জাবে সিকান্দার হায়াত খান, সিন্ধুতে আল্লা বক্স,বাংলায় ফজলুল হকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
লীগ যতই পাকিস্তানের দাবিতে চেঁচামেচি করুক না কেন, স্বাধীনতার এক বছর আগেও,১৯৪৬ এ পাঞ্জাবের ভয়াবহ দাঙ্গার আগে কেউ ভাবতেই পারেনি হিন্দু মুসলিম বিভেদের ভিত্তিতে দেশটা ভাগ হতে পারে।এই ভয়াবহ দাঙ্গার পর যারা কখনো দেশভাগ চায়নি,বা দেশভাগের চিন্তা কল্পনাতেও আনেনি তারাও সমাধান হিসেবে দেশভাগই চাইলো,ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, ধর্মীয় ভাবাবেগেই হোক আর হিংসা থেকে বাঁচার জন‍্যই হোক।

প্রত‍্যক্ষ সংগ্রাম ও ধর্মান্ধদের লক্ষ‍্যপূরণ


পরিস্থিতিকে দেশভাগের মতো এই অবস্থায় নিয়ে এল প্রবল উগ্রবাদী লীগপন্থীরা।কারণ, এটাই ছিল তাদের লক্ষ‍্যপূরণের একমাত্র উপায়।আর যেভাবেই হোক,তারা তাদের লক্ষ‍্যপূরণের জন‍্য ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।তাই তারা তাদের প্রবল ধর্মান্ধতা নিয়ে মেতে উঠলো উন্মত্ত হিংসায়, ১৯৪৬ সালের ১৬ ই আগস্ট, কলকাতার বুকে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ঘোষণা ক'রে।প্রবল হিংসায় রক্তস্নাত হল কলকাতা।নিহত হল পাঁচ হাজার মানুষ।শান্তিপ্রিয় মানুষও অশান্তিতে জড়াতে বাধ‍্য হল,যারা দাঙ্গাবাজ নয় তারাও দাঙ্গায় জড়াতে বাধ হল,যারা ধর্মান্ধ নয় তারাও ধর্মান্ধ হয়ে উঠতে বাধ‍্য হল,ধর্ম সম্পর্কে যারা আগ্রহহীন তাদের মধ‍্যেও জেগে উঠলো ধর্মীয় বিদ্বেষ।আর এসবই সম্ভব হল উগ্র ধর্মান্ধদের ঐকান্তিক তৎপরতার কারণে।তৈরি হল বিভেদের প্রাচীর।সৃষ্টি হল দেশভাগের উপযোগী অনুকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতি। দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লো নোয়াখালী, বিহার, পাঞ্জাবে।পাঞ্জাবে দাঙ্গা যে ভয়াবহ আকার নিলো তা দেশ ভাগ করা ছাড়া আর কোন আশা অবশিষ্ট রাখলো না।এইভাবে মুসলিম লীগের গুটিকয়েক উগ্র ধর্মান্ধ বিষাক্ত দাঙ্গার পরিবেশ সৃষ্টি ক'রে যে সব মুসলিম কখনো মুসলিম লীগকে সমর্থন করেনি তাদেরকেও মুসলিম লীগের পক্ষে নিয়ে আসতে সফল হল।এবং এইভাবে দাঙ্গার মাধ্যমে পাকিস্তানের পক্ষে ক্ষুদ্র সমর্থনকে বৃহত্তম সমর্থনে পরিণত করতে সমর্থ হল।যা রূপ লাভ করলো দেশভাগ ও পাকিস্তান সৃষ্টির মধ‍্য দিয়ে।

তাই ধর্ম যতদিন থাকবে ততদিন ধর্মের উগ্র অংশ অপেক্ষাকৃত নিস্ক্রিয় অংশকে ধর্মীয় উগ্রতা সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে এনে অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম হবেই, এবং এরা এরকমই করে যাবে চিরদিন।
Refugees driven from West Punjab
পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে বিতাড়িত শরণার্থী স্রোত

কোন মন্তব্য নেই:

Featured post

শীতের স্বাস্থ্য-সমস্যা ও তার প্রতিকার How to heal the health problems of Winter season

শীতে পরুন গরম পোশাক শীত একটি সুন্দর মনোরম ঋতু।কিন্তু শীতকাল অনেকের কাছেই খুব সমস্যার, বিশেষ করে যাদের ঠান্ডার ধাত বা অ্যাজমা ইত‍্যাদি...