লাস্ট পিরিয়ড শেষ হলেই স্কুল ছুটি।তাই লাস্ট পিরিয়ড যেন কাটতেই চায় না।বড়ই অধৈর্য লাগে।ছুটির ঘন্টা কখন বাজবে তার জন্যই মন উসখুস করতে থাকে।তাই শিক্ষক মশায় কি পড়াচ্ছেন সে দিকে মন দিতেই মন চায় না।
আবার সেই সকাল এগারোটা থেকে ক্লাসের বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে বিরক্তিও ধরে যায়।কাহাতক আর বসে থাকতে ভালো লাগে ? বিকেলের যে সময়টা মনটা চায় একটু ছুটোছুটি করে বেড়াতে সেই সময়টা ক্লাসরুমে বন্দী হয়ে থাকতে কারই বা ভালো লাগে ? এ যেন বাল্যবিকেলটাকে জোর করে আটকে রাখা।
সারাদিন পড়াশুনা করার পর ক্লান্ত শরীর ও মন যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারে না লাস্ট পিরিয়ডে শিক্ষকের এই ঘ্যানঘ্যানানি।
শরীর ও মনের পক্ষেও কি এটা স্বাস্থ্যকর ?
তার উপর বাড়ি ফিরেই আবার প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে বেরোতে হবে।
বিকেলে একটু খেলাধুলো তো দূরের কথা,হাত পা ছড়িয়ে যে একটু বিশ্রাম নেবো, বা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যে একটু গল্পগুজব করবো বা আড্ডা মারবো, তার জো ও নেই। উফ্,কি যে বিরক্তিকর !
শিক্ষার্থীর জীবনের সর্বাঙ্গীন বিকাশ ঘটানোই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।স্কুলের পঠনপাঠন কি তা করতে পারছে?শিক্ষার্থীর মগজকে তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর স্বাস্থ্যকে কি সমানভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে ? শিক্ষার ভারে তার দেহ মন শরীর স্বাস্থ্য ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে না তো ? শরীর ও স্বাস্থ্যকে সুঠাম ও সুস্থ করে গড়তে না পারলে শিক্ষার যে উদ্দেশ্য, জীবনের সর্বাঙ্গীন বিকাশ, তা কি সম্ভব ? আজকের শিশুই আগামীদিনের ভবিষ্যত।
দেহ,মন ও মগজ এর সুস্বাস্থ্য গড়ে তোলার জন্য পড়াশুনার পাশাপাশি সমানতালে শরীরচর্চাও জরুরী।কিন্তু আজকের প্রজন্ম অনেকাংশেই তা থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেকে পড়াশুনার চাপে একটুখানি খেলাধুলা বা শরীরচর্চা করার সুযোগ পায় না।আবার অনেকে তো আবার বইয়ের পোকা, খেলাধুলা বা শরীরচর্চা করা এদের চিন্তারও অতীত।উপরন্তু আবার বাবা মা পড়াশুনার জন্য যতটা চাপ সৃষ্টি করে খেলাধুলার জন্য সেই পরিমাণে উৎসাহ দেয় না। ফলে এমন এক একটা প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে যারা পড়াশুনায় ভালো হলেও শারীরিক ভাবে রুগ্ন হয়ে গড়ে উঠছে।এরা ভালো পড়াশুনা করে ভালো চাকরি পাবে।কিন্তু বয়স একটু বাড়লেই প্রেসার,সুগার ইত্যাদি নানারকম অসুখবিসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়বে,ফলে আয়ুষ্কালও কমে আসবে। এরা গড়বে দেশ ? এরা নিজেদের প্রেসার, সুগার নিয়ে এতটা চিন্তায় থাকবে যে, দেশ-সমাজ এর ভাবনা এদের মাথাতেও আসবে না।
আবার যারা পড়াশুনায় ভালো নয়,তারা যে খেলার মাঠে পড়ে আছে তাও কিন্ত নয়।আগে যেমন বিকেল হলেই ফুটবল নিয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়তো এখন কিন্তু তা আর দেখা যায় না।মাঠগুলো সব ফাঁকা পড়ে আছে।ছেলেপুলেদের আজকাল আর খেলার মাঠে দেখা যায় না,সব ঘরের কোণায় বসে মোবাইল নিয়ে টেপাটিপি করছে।ফলে একটা নিবীর্জ মেরুদন্ডহীন প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে। এ নিয়ে তাই এখনই চিন্তাভাবনা করার দরকার আছে।
তাছাড়া আমাদের দেশে মেয়েদের মাঠে নেমে খেলাধুলা করার চল নেই।মেয়েদের মধ্যে শরীরচর্চা করার প্রবণতাও তেমন নেই।অথচ সুঠাম ও সবল জাতি গড়ে তোলার জন্য মেয়েদের সুস্বাস্থ্য অতি জরুরী, এবং মেয়েদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা থাকাও খুব জরুরী, নিজের জন্যে তো বটেই,সন্তানের জন্যও।আমাদের দেশে মেয়েরাই বেশি ভগ্নস্বাস্থ্য,রুগ্নতা ও অপুষ্টির শিকার।
হাসপাতালগুলো ও ডাক্তারখানায় যে পরিমাণ ভিড় তা রীতিমতো উদ্বেগজনক।জনগন সব আজ হাসপাতালমুখী।
এই অবস্থাকে পরিবর্তন করতে হলে, জাতির প্রাণে নতুন শক্তি সঞ্চার করতে হলে স্কুল থেকেই তা শুরু করতে হবে।
হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, লাস্ট পিরিয়ড।স্কুলের লাস্ট পিরিয়ডেই তা করতে হবে।লাস্ট পিরিয়ডটায় নেতিয়ে পড়ার পরিবর্তে এই পিরিয়ডকেই জীবনে প্রাণশক্তি সঞ্চার ও নতুন জীবনীশক্তি গড়ে তোলার কাজে লাগাতে হবে।
কি করে ?
লাস্ট পিরিয়ডে ছেলেমেয়েদের সব মাঠে নামিয়ে দিতে হবে।তারা পুরো পিরিয়ড ধরে খেলাধুলা, লম্ফঝম্প,ব্যায়াম, প্যারেড ইত্যাদি করবে।এবং অবশ্যই শিক্ষক শিক্ষিকাদের পরিচালনায় নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলা মেনে।একজনও এর বাইরে থাকবে না।সেইসঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষিকারাও শরীরচর্চা করবে।দেশে রোগ বলে কিছু থাকবে না,রোগী বলে কিছু থাকবে না।
স্কুলজীবনে প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট শরীরচর্চা করার অভ্যাস গড়ে উঠলে সারাজীবন এই অভ্যাস বজায় থাকবে।ফলে সুঠাম ও সুস্থ শরীর গড়ে উঠবে।কোন রোগ অসুখবিসুখ কখনো এদের ধারেকাছে আসতে পারবে না। ফলে গড়ে উঠবে জীবনীশক্তিতে ভরপুর একটি সুস্থ সবল জাতি। ফলে ব্যক্তিজীবনের সর্বাঙ্গীন বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জাতিরও সর্বাঙ্গীন বিকাশ ঘটবে।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন