বুধবার, ১৫ মে, ২০১৯

সমাজে এত হুলিগান কেন ?

সমাজে এত হুলিগান এলো কোথা থেকে ? 

Why are there so many hooligans in society ?
Hooligan

সমাজে হুলিগান দের এত দাপাদাপি কেন ? এত দাপট কেন ? এত বাড়াবাড়ি কেন ? এত বিপুল সংখ্যায় হুলিগান কেন তৈরি হচ্ছে সমাজে ? হুলিগান দের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায় নির্বাচনের সময় ? বোমা মারা, ছাপ্পা মারা, বুথ দখল, রিগিং, সন্ত্রাস যা কিছু আইন বিরুদ্ধ সবকিছুই এরা করছে এবং এসব করার মধ্য দিয়ে ভোটের ফল নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক দলের মদতেই এরা এ কাজ করছে নিশ্চয়ই, এবং নিশ্চয়ই নিঃস্বার্থে নয়, নিশ্চয়ই স্বার্থ রয়েছে, এবং সেই স্বার্থ সম্ভবত অর্থের বা টাকার স্বার্থ। সেই সঙ্গে রয়েছে হয়তো নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির স্বার্থ বা এলাকায় নিজের অবৈধ কাজকর্ম বা এলাকায় নিজের দাদাগিরির প্রভাব বৃদ্ধির স্বার্থ। কথা হল, এই কাজগুলো কোন ভদ্র পরিবারের শিক্ষিত ও সচ্ছল যুবকরা করবে কিনা, মনে হয় নয়। তাহলে করছে কারা ? এদের শ্রেণী চরিত্র কি ? এরা কেন এসব কাজ করছে ? কেন এসব কাজ করতে মাঠে নামছে ? অন্যায়, অবৈধ আইনবিরুদ্ধ কাজ কেন করতে বাধ্য হচ্ছে বা করছে ? এগুলো না করলেই কি নয় ? 
আমরা এদের শ্রেণী চরিত্র, আর্থসামাজিক অবস্থা- এসব নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করবো--

শ্রেণীচরিত্র, আর্থসামাজিক অবস্থা

একজন শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যেই হোক স্বাবলম্বী স্বনির্ভর সচ্ছল মানুষ নিশ্চয়ই টাকার লোভে মারপিট করতে যাবে না, বোমা মারতে যাবে না, সন্ত্রাস চালাতে যাবে না। হয়তো বা নিজের প্রভাব বৃদ্ধির জন্য, রাজনৈতিক প্রভাব হোক, এলাকায় নিজের দাদাগিরির প্রভাব হোক, তার জন‍্য এ ধরনের আইনবিরুদ্ধ কাজ করলেও করতে পারে। কিন্তু অর্থের লোভে সে কখনো এসব কাজ করতে যাবে না। কিন্তু যারা এসব কাজ করছে, অসংখ্য অগণিত তারা, তারা সবাই যে তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থে বা এলাকায় নিজের রাজত্ববৃদ্ধির স্বার্থে কাজ করছে তা নয়, অনেকে পয়সার লোভে ও মদ মাংস খাওয়ার লোভে  করছে, আবার অনেকে এসব কাজ করছে এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাপে বাধ্য হয়ে, হয়তো করতে বাধ্য হচ্ছে, আইন বিরুদ্ধ কাজে নামতে বাধ্য হচ্ছে। এসব কাজে হাত না লাগালে সামাজিক ভাবে সে হয়তো অসুবিধার মুখে পড়বে। তাই তাকেও বাধ্য হয়ে দলে ভিড়তে হচ্ছে- এরকম উদাহরণ থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু এরা ক'জন ? যেটুকু দেখে বোঝা যায়, তাতে মনে হয়, বেশিরভাগ যুবক সম্প্রদায় যে কারণেই হোক ক্ষনিকের কিছু পাওয়ার লোভে, আর সেই লোভটার মধ্যে অর্থের লোভে মনে হয় বেশি, আর এই লোভের দ্বারা চালিত হয়ে, বিশেষ করে বেকার যুবক সম্প্রদায় যাদের কোনো স্থায়ী কাজ নেই, তারা হয়তো কোন কাজ পাওয়ার লোভে বা কোন ব্যবসায়িক লোন পাওয়ার লোভে, সহজ রাস্তাতে নগদ টাকার লোভে বা অন্যান্য আরো কিছু উপরি পাওনার লোভে হয়তো এসব আইনবিরুদ্ধ সন্ত্রাসমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে বা অংশগ্রহণ করছে। আমাদের দেখতে হবে বর্তমানে চাকরির বাজার, সরকারি চাকরি হোক বা বেসরকারি চাকরি হোক খুবই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কল-কারখানা অনেক বন্ধ হয়ে গেছে, শিল্পের প্রসার নেই, কর্মের নিশ্চয়তা নেই। বেকার যুব সমাজ তাই আজ দিশাহারা। কাজ নেই, চাকরি নেই, ব্যবসা নেই, সৎ পথে সৎ রাস্তায় সৎ কাজ করে বেঁচে থাকার উপায় নেই। তাদের চোখের সামনে তাই হতাশা আর শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই। আর রয়েছে বুক ভরা বেকারত্বের জ্বালা। জীবনের সাধ আহ্লাদ স্বপ্ন সবই তো প্রায় অকূল পাথারে নিমজ্জমান। তারা তাই আজ হতাশার সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। তাই কিছু পাওয়ার আশায় তারা যখন সামান্য সুযোগ পাচ্ছে, সেই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাচ্ছে, আর দুঃসাহসে ভর করে নেমে পড়ছে অসৎ কাজে। এই হতাশাগ্রস্ত আদর্শহীন যুব সমাজ, এরা আজ অনেকটা কাঁচামালের মত ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলির দ্বারা। রাজনৈতিক দলগুলি এবং তাদের নেতৃবৃন্দ ভোটে জয় লাভের জন্য যেকোনোভাবে জয় ছিনিয়ে আনার জন্য যেখানেই তারা পরাজয়ের লক্ষণ দেখছে সেখানেই এই যুব সমাজকে কাজে লাগিয়ে, এদের পিছনে অর্থ ব্যয় ক'রে, এদেরকে দিয়ে আইনবিরুদ্ধ কাজ করিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি ক'রে, বুথ দখল ক'রে, ছাপ্পা রিগিং ক'রে বা মানুষের মনে সন্ত্রাস সৃষ্টি ক'রে নিজেদের রাস্তা তৈরি করছে। এই যুব সমাজ এই ধরনের কাজকর্ম করতে গিয়ে অনেকেই মারা পড়ছে, অনেকেই হচ্ছে আহত, কিংবা অন্যদের মারছে বা আহত করছে। ক্ষতি হচ্ছে সমাজের। ক্ষতি হচ্ছে মানুষের। ক্ষতি হচ্ছে এদের নিজেদের ও দূষিত হচ্ছে সমাজ, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, ধ্বংস হচ্ছে গণতন্ত্র। নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদে এরা গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করছে। এদের হতাশার আগুনে গণতন্ত্র চিতার আগুনে পুড়ে দগ্ধ হচ্ছে। এরা যেন গণতন্ত্রের ডেডবডিকে চিতায় তুলে দাহ করছে। গণতন্ত্র এদের জীবনের সাধ আহ্লাদ আশা-আকাঙ্ক্ষা কামনা বাসনা মেটাতে পারেনি বা মেটায়নি বা মেটানোর চেষ্টা করেনি। গণতন্ত্রের মুখোশ পরে কেবল মানুষের সঙ্গে লুকোচুরি খেলাই চলছে, এই যুব সম্প্রদায়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা চলছে, এদের সঙ্গে চালাকি করা হচ্ছে। এদের কর্মসংস্থান তৈরি করা হচ্ছে না; এদের জীবনের কথা, এদের ভবিষ্যতের কথা, এদের আশা আকাঙ্ক্ষার কথা ভাবা হচ্ছে না, বা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এদেরকে কেবল ভোটের কাজে, হিংসার কাজে, অনৈতিক কার্যকলাপ করানোর কাজে ব্যবহার করার জন্য হিসাব করে রেখে দেওয়া হয়েছে। যুব সমাজ তাই আজ হতাশাগ্রস্থ দিশাহারা বিভ্রান্ত ও বিপথে চালিত, ধ্বংসাত্মক কাজে মত্ত। 

এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করার, সেটা হল, দেখা যাচ্ছে এবং আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও আমি বলছি, যেসব এলাকা যথেষ্ট সচ্ছল শিক্ষিত স্বনির্ভর; অর্থনৈতিকভাবে, শিক্ষাগতভাবে এগিয়ে, সেইসব এলাকার বুথে কোন গন্ডগোল হয় না, কোন অশান্তি হয় না, কোনো সন্ত্রাস হয় না, কোন সমস্যা হয় না, শান্তিপূর্ণ ভোট হয়। কারণ সেখানে সমস্যা তৈরি করার মতো, সন্ত্রাস করার মত বা করানোর মতো কাউকে পাওয়া যায় না, বা তারা এসব করার প্রয়োজন মনে করে না। তারা নিজের সম্পর্কে সচেতন, নিজেদের স্বার্থ সম্পর্কেও সচেতন, নিজেদের জীবন সম্পর্কেও সচেতন। তাদের কাছে নিজেদের জীবনের মূল্য রয়েছে, তারা নিজেদের জীবনের মূল্য বোঝে এবং জীবন নষ্ট হতে পারে বা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এ ধরনের কাজে তারা লিপ্ত হতে যায় না। তাই সেসব অঞ্চলে ভোটে অশান্তি হয় না।

তাহলে কোন সব অঞ্চলে ভোটে অশান্তি হয় ? দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিকভাবে, শিক্ষাগতভাবে যে সব এলাকা পিছিয়ে, যেসব এলাকায় রয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদের প্রভাব, যেসব এলাকার মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মৌলবাদী মানসিকতা প্রকট, দেখা যাচ্ছে সেসব এলাকায় ব্যাপক সন্ত্রাস সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকলে সেখানে সন্ত্রাস হবে তা নয়। এরকম কিছু কিছু এলাকা রয়েছে যেখানকার সামাজিক অবস্থা খুব খারাপ। সামাজিক অবস্থা খারাপের পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেসব এলাকায় বিভিন্ন অসামাজিক অবৈধ ব্যবসা, গরু পাচার হতে পারে, চোরাচালানের পরিবেশ থাকতে পারে, কয়লা খনি এলাকার মাফিয়াদের প্রভাব থাকতে পারে। সামাজিক ভাবে এরকম অঞ্চলগুলোতে ভোটে অশান্তির সম্ভাবনা খুবই বেশি এবং আমরা সেটাই দেখে থাকি।
হুলিগান আতঙ্ক
হুলিগান-আতঙ্ক

 বাস্তবে আরো একটা ব্যাপার বোঝার আছে, সেটা হলো, সামাজিক ভাবে দুর্বল শ্রেণীর উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেও তাদেরকে দিয়ে ভোটের সময় আইনবিরুদ্ধ কাজ করানো হয়ে থাকে বা ভোটের কাজে লাগানো হয়ে থাকে, এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ থেকে,রাজনৈতিক রক্তচক্ষু থেকে বাঁচার জন্য তারা এসব কাজ করতে বাধ্য হয় নিজেদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও। আমরা দেখতে পাচ্ছি সল্টলেকে বা প্রপার কলকাতায় বা এই ধরনের আর্থসামাজিক এলাকাগুলোতে ভোটের সময় কোন অশান্তি হতে দেখা যাচ্ছে না। অশান্তি হচ্ছে কিরকম এলাকায় ? দেখা যাচ্ছে, ভাঙ্গড়, কেশপুর, ব্যারাকপুর এর কারখানা অধ‍্যুষিত বা যেকোন বস্তি অধ্যুষিত এলাকায় যেখানে নিম্নবর্গের মানুষ, বা ধর্মীয় মৌলবাদী মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের বাস, বা যেসব এলাকা দুর্বৃত্ত অধ্যুষিত বা অবৈধ ব্যবসা কবলিত সেসব এলাকায় আমরা অধিক পরিমাণে ভোটে অশান্তি লক্ষ্য করছি। 

কোথায় আছে সমাধান 

এটা তো চলতেই আছে। একটার পর একটা নির্বাচনে আমরা একই দৃশ্য দেখে যাচ্ছি। এরকম চলতে থাকবে ? এটাই কি গণতন্ত্রের সংস্কৃতি হওয়া উচিত ? গণতন্ত্রের উৎসবে একটা মানুষের প্রাণ নষ্ট হোক, একটা মানুষের জীবনের ক্ষতি হোক- আমাদের কি এটা আশা করা উচিত ? আমরা কি পাবো না একটা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ? আমরা কি চাইব না একটা সুন্দর যুবসমাজ- যে যুবসমাজ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হবে, শিক্ষাগত দিক দিয়ে উন্নত হবে, স্বনির্ভর হবে, আত্মবিশ্বাসী হবে, যাদের মন প্রাণ থাকবে আনন্দ এবং তেজে ভরপুর ? তাহলে গণতন্ত্র কে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য গণতন্ত্রের নেতৃত্বে যারা আছেন, যাদের হাতে সরকারের ক্ষমতা তাদের কি উচিত নয় সর্বাগ্রে যুবসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা, তাদের হতাশা বেকারত্ব দূর করা, তাদেরকে সচ্ছল ও স্বনির্ভর করে তোলা, তাদের অধিকার ও চাহিদা মেটানো ? সে কাজের প্রতি সরকারের কেন এত অনীহা ? কেন তেমন উৎসাহ উদ্যোগ এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না ? সরকারের তরফ থেকে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা তৈরি হচ্ছে না ? কেন নতুন নতুন স্কুল কলেজে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না ? কেন বিভিন্ন দপ্তরে বিভিন্ন কর্মী পদ শূন্য হয়ে পড়ে থাকছে ? কেন সেই সব স্থানে ভ্যাকান্সি পূরণ করা হচ্ছে না ? সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্র কেন প্রসারিত করা হচ্ছে না ? কেন তাদের জন‍্য ব্যবসার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করা হচ্ছে না ? কোন সরকার যদি এই প্রাথমিক কাজগুলো না করে তাহলে সেই সরকার দিয়ে কি হবে ? আর সেই সরকার গড়ার জন্য নির্বাচন করার কি দরকার ? সেই নির্বাচনের জন্য এত মানুষের জীবন নষ্ট করার কি দরকার ? এত অর্থ অপচয় করার কি দরকার ? এই অর্থ নির্বাচনের পিছনে নষ্ট না করে এই অর্থ দিয়ে শিল্প কারখানা তৈরি করা যেত, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা যেত। আসলে আমরা যত কথাই বলি না কেন, কোন কথাতেই কোন কাজ হবে না, যতক্ষণ না মানুষ নিজে সচেতন হবে। যেসব এলাকায় মানুষ সচেতন, শিক্ষিত, স্বনির্ভর, সচ্ছল সেখানে কিন্তু কোন কুটিল ষড়যন্ত্র কার্যকরী হয় না। মানুষ কুটিলতার দ্বারা প্রভাবিত হয় না। সেখানে কোনো অশান্তির বা সমস্যা হয় না। যেখানে মানুষ অশিক্ষিত, অসচ্ছল ও অসচেতন এবং আর্থসামাজিকভাবে দুর্বল সেখানেই ক্ষমতাবান ক্ষমতালোভী প্রভাবশালী শ্রেণী মানুষের উপর কর্তৃত্ব করে, মানুষকে দিয়ে অকাজ কুকাজ করাতে পারে। এজন্য তুমি শিক্ষিত হতে না পারো অন্তত সচেতন হও। হয়তো শিক্ষিত হওয়ার জন্য তোমাকে পড়াশোনা করা লাগবে, অনেকগুলো বছর ধরে তোমাকে পড়াশোনা করতে হবে, অনেক পয়সা নষ্ট করতে হবে, বছরের পর বছর পড়াশোনা করে একটার পর একটা ক্লাস পার হওয়ার পর তবে শিক্ষিত হতে পারবে। কিন্তু তুমি যদি শিক্ষিত না হতেও পারো, সচেতন তো হতে পারো। সচেতন হওয়ার জন্য পয়সা লাগে না। দরকার শুধু আত্ম উপলব্ধি। তুমি নিজেকে উপলব্ধি করো, তোমার সমাজের অবস্থাকে বোঝার চেষ্টা করো, কিসে তোমার লাভ বোঝার চেষ্টা করো। তোমার সমাজ ভালো থাকলে তুমি ভালো থাকবে, তোমার সমাজ নষ্ট হলে তুমি নষ্ট হবে- এই বোধটাই হচ্ছে সচেতনতা। এই সচেতনতা টুকুই অনেক। এটুকু সচেতনতা থাকলে আমরা অনেক এগোতে পারি, অনেক ভালো কাজ করতে পারি। সব সময় সবার পক্ষে শিক্ষিত হয়ে ওঠা সম্ভব নয় আর্থসামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করলেই বিনা পয়সাতে সচেতন হতে পারি। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় মূলধন হল সচেতন জনসম্পদ, মানুষের সচেতনতা। মানুষ যেখানে সচেতন সেখানে কোন দুর্বৃত্ত কোন দুরভিসন্ধিমূলক কাজ করতে সফল হবে না, গণতন্ত্রকে নষ্ট করতে পারবে না। মানুষের সচেতনতা সমস্ত নষ্টামিকে প্রতিরোধ করতে পারে এবং গণতন্ত্রকে, রাষ্ট্রকে, সমাজকে ও যুব সমাজকে সঠিক পথে চালিত করতে পারে। আর সেটাই হচ্ছে সমস্যার আসল সমাধান। সচেতনতা থেকে বড় ঔষধ বা বড় সমাধান আর কিছুই নেই। সচেতনতা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে।

কর্মহীন শিক্ষিত যুবকেরাই কি তাহলে হুলিগানে পরিণত হচ্ছে ?

না।
কেউ হয়তো বা সে পথে পা বাড়াতেও পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, শিক্ষিত কর্মহীন বেকার যুবসমাজ সব হুলিগানে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, শিক্ষিত যুব সমাজের কর্মহীনতা, বেকারত্ব হুলিগানের সংখ্যা বৃদ্ধি করছে, নৈরাজ্য বৃদ্ধি করছে। কিভাবে ? এই শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের কর্মহীনতা বা বেকারত্বের কারণে এই অশিক্ষিত অদক্ষ যুবকরা,সাধারণ শ্রমজীবী মানুষেরা কাজ হারাচ্ছে বা কম কাজ পাচ্ছে বা তাদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। কিভাবে ? এরা যদি চাকরি পেত,কাজ পেত, আয় করত, তাহলে সেই পয়সা ভোগ করত। আর এদের সেই ভোগের মাধ্যমে অদক্ষ অশিক্ষিত কর্মীরা উপার্জনের পথ খুঁজে পেত। কেউ তার বাড়িতে কাজ ক'রে, বাড়ি-ঘর তৈরি ক'রে, কেউ তাকে খাদ্য যুগিয়ে, পোশাক যুগিয়ে। শিক্ষিত যুব সম্প্রদায় চাকরি পেলে মানুষের হাতে, সমাজে, পরিবারের মধ্যে অর্থের যোগান বাড়ে। ফলে বাজারে চাহিদা বাড়ে। ফলে এদের আয়কৃত অর্থ বাজারে যত ঢুকবে তত আরো বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে পরোক্ষভাবে। এরা যত বেকার হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, এদের উপর নির্ভরশীল হতে পারতো পরোক্ষভাবে যে অদক্ষ দিনমজুর বা শ্রমজীবি মানুষ, তাদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে পড়বে। ফলে তারাই হুলিগানের দল বৃদ্ধি করবে। তারাই হুলিগানে পরিণত হবে। শিক্ষিত স্বনির্ভর সমাজ তার পরবর্তী ধাপের অশিক্ষিত অদক্ষ মজুর, দিনমজুর, শ্রমজীবী মানুষ, সাধারণ কর্মী মানুষ তাদেরকেও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে ভদ্রভাবে বাঁচার রাস্তা তৈরি করে দেয়। কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রের উন্নতিও মানুষকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে চালিত করে। মানুষ যদি শান্তিতে কাজকর্ম করে জীবিকা অর্জন করে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে কে হিংসা মারামারি হানাহানির মধ্যে যাবে ? সমাজের কিছু মানুষ এমনিতেই থাকে অপরাধপ্রবণ, তাদের কথা আলাদা। অতএব হুলিগানদের সাপ্লাই হচ্ছে সমাজের যে স্তর থেকে সেই স্তরকে যদি নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া যায়, শান্তিপূর্ণ ভাবে জীবিকা অর্জনের রাস্তার সন্ধান দেওয়া যায় তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমাজে আর হুলিগান খুঁজে পাবে না। ফলে সমাজে আর অশান্তি তৈরি হবে না। স্বাভাবিকভাবেই সমাজ শান্ত থাকবে। ওই মানুষগুলোই তখন অশান্তির বিরোধিতা করবে এবং নিজেদের শান্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে এবং সামাজিক শান্তি রচনায় এরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে।
 ‎

একটা সুন্দর সমাজ মানুষের জীবনে সফলতা নিয়ে আসে-

একটা সুন্দর সমাজ মানুষের জীবনে সফল হতে বড় ভূমিকা পালন করে। একটা সুন্দর সমাজ মানুষকে বেঁচে থাকার নিরাপত্তা দেয়, জীবনের নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করে, বেঁচে থাকার শান্তিকে সুনিশ্চিত করে। ফলে শান্তিপূর্ণ মনে মানুষ নিজের উন্নতির কাজে সময় অতিবাহিত করতে পারে বা সময় দিতে পারে বা নিজেকে নিযুক্ত করতে পারে। কিন্তু একটা অশান্তিতে পরিপূর্ণ সমাজ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে, তার মনকে অশান্ত করে, তাকে বাধার সম্মুখীন করে। সে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সামনে প'ড়ে, বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে তার জীবনের সাফল্যের পথে এগোতে বাধা পায় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার জীবনের আনন্দ, সুখ, সাফল্য নষ্ট হয় বা জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু একটা সুন্দর সমাজ মানুষকে সফলতা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন সফলতার আনন্দে এবং সুখে ভরে তোলে। সুন্দর সমাজে বসবাসকারী মানুষ সুখী মানুষ হতে পারে। একটা সুন্দর সমাজ মানুষকে সফল করার পাশাপাশি তাকে সুখী করে তোলে, তার জীবন আনন্দে ভরে তোলে। তাই আমাদের সবারই উচিত সমাজকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। মানুষের জীবনে সাফল্য নিয়ে আসতে পারে বা সাফল্যের অনুকূলে ভূমিকা পালন করতে পারে আমাদের সবার উচিত সেরকম সমাজ তৈরি করা। সবাই মিলে সচেষ্ট হয়ে সেটা করা সম্ভব। এর জন্য আমাদের সৎ বুদ্ধির প্রয়োজন, প্রগতিশীল মানসিকতার প্রয়োজন। পশ্চাত্পদ মানসিকতা বা হীন মানসিকতা আমাদেরকে কিন্তু ব্যর্থতায় ডুবিয়ে দেয়। কবি বলেছেন, 
"রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়
 আত্মগ্লানির নরক-অনলে তখনি পুড়িতে হয় 
 ‎প্রীতি ও প্রেমের পূণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরস্পরে 
 ‎স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুঁড়েঘরে।‌।" একটা নোংরা সমাজ নরকের সমতুল। একটা সুন্দর সৃষ্টিশীল প্রগতিশীল আনন্দমুখর সমাজে বাস করার মধ্য দিয়ে পৃথিবীতেই স্বর্গ বাস হয়ে যায়।
 ‎ একটা সুন্দর সমাজে জমি জায়গার দাম বেশি। কারণ সবাই সুন্দর সমাজে বাস করতে চায়, সুন্দর ভাবে জীবন কাটাতে চায়। তাই ভালো পরিবেশে বা সুন্দর সমাজে জমি জায়গার চাহিদা বেশি। তাই দামও বেশি। শুধু তাই নয়, একটা সুন্দর সমাজে বসবাসকারী মানুষের দামও বেশি। 
 ‎পক্ষান্তরে, একটা নোংরা কুৎসিত সমাজে জমি জায়গার দাম কম। তার কারণ, মানুষ বাজে সমাজে বাস করতে চায় না, ফলে চাহিদা কম। তাই দামও কম। শুধু জমি জায়গার দাম কম নয়।একটা থার্ডক্লাস সমাজে বসবাসকারী মানুষের দামও কম, অন্য এলাকার মানুষের চোখে, এমনকি তার নিজের এলাকার মানুষের চোখেও। একটা সুন্দর সমাজ মানুষকে হাত ধরে টেনে উপরে তোলে। আর একটা দূষিত সমাজ মানুষকে ঠ‍্যাং ধরে টেনে নিচে নামায়।
একটা পচা সমাজে পচা মালগুলোই হয় নেতা।তারাই তৈরি করে হুলিগান,তারাই পোষে হুলিগানদের।আর সমাজ হয়ে উঠতে থাকে আরো বেশি নোংরা, পচা,দুর্গন্ধ ও দূষিত।
কিন্তু একটা সুন্দর সমাজ সবসময়ই মার্জিত, যোগ‍্য  ও প্রগতিশীল ব‍্যক্তিকেই নেতৃত্বের আসনে বসায়।আর সে সঠিক দিশায় সমাজকে চালিত করে,এবং সমাজও উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যায়।।

কোন মন্তব্য নেই:

Featured post

শীতের স্বাস্থ্য-সমস্যা ও তার প্রতিকার How to heal the health problems of Winter season

শীতে পরুন গরম পোশাক শীত একটি সুন্দর মনোরম ঋতু।কিন্তু শীতকাল অনেকের কাছেই খুব সমস্যার, বিশেষ করে যাদের ঠান্ডার ধাত বা অ্যাজমা ইত‍্যাদি...